কোথায় আমাদের ব্যর্থতা?

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৭

দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে উপমহাদেশে উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী, জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক মতলববাজেরা যে কোনো ধরনের হামলা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে পারে—এই আশঙ্কা করিয়া পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে পূজার পূর্বেই সেই দেশের ইন্টেলিজেন্স হইতে সতর্কতা জারি করা হইয়াছিল। হামলা কিংবা অরাজকতা প্রতিরোধে সেইখানে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হইয়াছিল। প্রতিটি মণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দিয়াছে, পূজা উদ্যাপনকারী প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে নির্দিষ্ট দূরত্বও বজায় রাখিতে হইয়াছে। ইহার পাশাপাশি যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাহাতে না ঘটে সেই জন্য সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারিও বাড়ানো হইয়াছিল। নাশকতার অভিযোগে সেইখানে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতারও করা হইয়াছিল। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের নিউজ চ্যানেলগুলিতে পূজা উপলক্ষ্যে হামলা কিংবা নাশকতার আশঙ্কার বিষয়টি প্রচার করা হইয়াছে, দেখানো হইয়াছে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার হইবার খবরও। লক্ষণীয় বিষয় হইল, তাহারা যে শুধু নিজেদের দেশেই হামলা কিংবা নাশকতার আশঙ্কার কথা বলিয়াছিল তাহা নহে, বরং পূজাকে কেন্দ্র করিয়া তাহাদের দেশ জুড়িয়া এবং উপমহাদেশের যে কোনো স্থানেই হামলার আশঙ্কার কথা বলিয়াছিল। তাহাদের ইন্টেলিজেন্স হইতে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইয়াছিল।

উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির জনসংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেই পরিমাণ ইন্টেলিজেন্স সাপোর্ট প্রয়োজন হয় সেই পরিমাণ সামর্থ্য কিংবা প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের হয়তো ঘাটতি থাকে, কিন্তু পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে যেইখানে উপমহাদেশে বারবার হামলা কিংবা নাশকতার আশঙ্কার কথা বলা হইয়াছিল সেইখানে সংশ্লিষ্ট অন্য দেশগুলির ইন্টেলিজেন্সে যাহারা কাজ করিয়া থাকেন, তাহাদের কি সতর্ক হইয়া যাওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল না? গত কয়েক দিনে দেশের বেশ কিছু স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে আক্রমণের ঘটনা ঘটিল, যাহা শুধু দুঃখজনকই নহে, অত্যন্ত লজ্জার। অথচ হামলা কিংবা নাশকতা হইবার তথ্যটি কি আমরা পূর্ব হইতেই পাই নাই? সেই তথ্য কি কাজে লাগাইতে পারি নাই? এই প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক থাকিয়াই যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানে দুষ্কৃতকারীদের হামলা ও নাশকতার ঘটনার পর মামলা হইয়াছে, হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হইয়াছে। ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর বলাও হইতেছে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সহ্য করা হইবে না, কঠোরভাবে দুষ্কৃতকারীদের দমন করা হইবে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশটিতে পূজাকে উপলক্ষ্য করিয়া পূর্ব হইতেই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা হইয়াছিল বলিয়াই সেইখানে কোনো রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে নাই।

আমরা দেখিতে পাই, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে কোনো ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর অনেকেই নানা ধরনের উপদেশ দিয়া থাকেন, বড় বড় বক্তৃতা দিয়া সভা গরম করিয়া থাকেন। ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর এই ধরনের উপদেশ কিংবা বক্তব্যের কোনো মানে থাকে না। আবার বহু ক্ষেত্রে মতলববাজেরা অন্যের ঘর পোড়া আগুনে আলু পুড়াইয়া খাইবার অপচেষ্টা করিয়া থাকে। আমরা অতীতেও দেখিয়াছি, পাকিস্তান আমলে যেই বড় বড় দাঙ্গার ঘটনা ঘটিয়াছে সেইখানেও মতলববাজেরা অন্যের ঘরে আগুন লাগাইয়া আলু পুড়া তো খাইতই, ঘটনার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করিবার অপচেষ্টায়ও লিপ্ত থাকিত। সুতরাং সর্বক্ষেত্রেই চোখ-কান খোলা রাখিতে হইবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে যে কোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে আরো সচেতন হইতে হইবে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিবার পূর্বেই গোয়েন্দা তথ্য কিংবা ইন্টেলিজেন্সের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হইবে। চোখ বন্ধ করিয়া ঠান্ডা মাথায় ভাবিয়া দেখিতে হইবে—কোথায় আমাদের ব্যর্থতা?