চিকিত্সাসেবার উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পায়নি। প্রতি বছর বহু শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। গ্রামাঞ্চলে এটি একটি বড় সমস্যা। গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ বাড়ি অরক্ষিত থাকে। ফলে সহজেই শিশুরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে জলাশয়ের কাছে যেতে পারে। আর এতেই ঘটে বিপত্তি।
সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশের তথ্যে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু কোনো না কোনো আঘাতের কারণে মারা যায়। তার মধ্যে ১৮ হাজার শিশুই মারা যায় পানিতে ডুবে। পানিতে ডুবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০টি শিশুর মৃত্যু ঘটে। সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে মারা যায় এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশু।
বর্ষাকাল ও তার পরবর্তী সময়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। বর্ষা ঋতুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মুষলধারে বৃষ্টিপাত। ফলে বাংলার নদীনালা, খালবিল, ডোবা বৃষ্টির পানিতে কানায় কানায় ভরে যায়। এই সময়টায় সামান্য অসচেতনতায় ঘটে যায় দুর্ঘটনা। গ্রাম বাংলায় নদী ও পুকুরের সংখ্যা বেশি। শিশুরা নিছক খেলাচ্ছলে কিংবা অসাবধানতায় পুকুরে পড়ে গেলেই আর তাদের ওপরে ওঠা সম্ভব হয় না।
আইসিডিডিআরবির সমীক্ষায় জানা যায়, পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি শিশু মারা যায় বছরের মে থেকে অক্টোবর সময়ের মধ্যে। বর্ষা মৌসুমে নদীনালা, ডোবা, পুকুর বর্ষা ও বৃষ্টির পানিতে ভরে থাকে। এ সময় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ৮২ শতাংশ, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। পরিবারের সবার সচেতনতা অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে পারে, রক্ষা করতে পারে আমাদের অনেক শিশুর প্রাণ। বর্ষাকালে শিশুর অভিভাবকদের অধিক সতর্ক থাকতে হবে।
পরিবারে শিশু যাতে সুরক্ষিত থাকে, সে ব্যাপারে বাবা-মা এবং সবাইকে সচেতন হতে হবে। পরিবারে মা যদি গৃহস্থালির কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে শিশুর দায়িত্ব কাউকে না কাউকে দিতে হবে। সম্ভব হলে পুকুর, নালা, ডোবা এলাকায় যাওয়ার পথে বাউন্ডারি দিয়ে ফটকের ব্যবস্থা করে বাড়িটি শিশুর বসবাসের উপযোগী করতে হবে। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সচেতনতা এবং সাঁতার শেখার কোনো বিকল্প নেই। পানিতে ডুবে শিশু মারা যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার অন্যতম ব্যবস্থা হচ্ছে সব শিশুকে চার বছর বয়সের পর থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সাঁতার শেখানো।
প্রতিটি শিশুকে সময়মতো সাঁতার শেখানো হলে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
সাঁতার জানা মানুষ নিজ জীবন সুরক্ষাসহ পানিতে ডুবে যাওয়া অপরকেও বাঁচাতে পারে। রাজধানীতে অনেক সাঁতার শেখানোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। এসব সাঁতার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সাঁতার শেখা বেশ ব্যয়বহুল। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে সাঁতার প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল যে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এটি পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যায় বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ-সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত সুবিধা এবং সরঞ্জাম নেই।
বাংলাদেশে শিশুর মৃত্যুঝুঁকির ঘটনা প্রতিরোধে অনেক কর্মসূচি থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ সমন্বিত কার্যক্রম খুবই সামান্য। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধ করার জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রতিরোধ এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে কলাকৌশলের পরিবর্তন এবং প্রচলিত পদ্ধতির উন্নয়ন ও পুনঃপ্রবর্তন করা। সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু অনেকটাই হ্রাস পাবে।
n লেখক : শিক্ষা, দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, ডেমরা, ঢাকা
