বুদেরামের কূপে পড়া

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখচ্ছবি

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:২৯

মা হ বু ব  আ ল ম 

 

সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ঠিক না থাকলে সামাজিকগণ নানা রকম মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগে। নানাবিধ রোগ দেখা দেয় মস্তিষ্কে। সে রোগের চিকিত্সা থাকে না চিকিত্সা বিজ্ঞানে। সমাজ কাঠামোই পারে সে রোগের সহজ ওষুধ দিতে। অনুশীলন নাট্যদলের ‘বুদেরামের কূপে পড়া’ তেমনি এক নাটক। নাট্যকার মলয় ভৌমিক সমাজের এমনি এক রোগের কথা বুদের মুখ দিয়ে তুলে এনেছেন নাটকে। ইচ্ছে হওয়াটা বুদের একটা বড় রোগ—সে রোগের কারণে বুদে মরতে চায় কিন্তু কোথায় মরবে বুদে? বুদে ঠিক করেছে সে একটি কূপের মধ্যে ডুবে মরবে। কূপের মধ্যে ডুবে মরার জন্য সে দুজন লোকও ভাড়া করে। তারা কাঁধে করে নিয়ে আসে বুদেকে সেই কূপের কাছে। কূপে পড়ার আগে বুদের নানা রকম ইচ্ছে জাগে। বুদের কথার মারপ্যাঁচে অতিষ্ট হয়ে ওঠে লোকদুটি। তাদের মধ্যে অবশ্য মায়াও জাগে—যেহেতু লোকটি মরতে যাচ্ছে তাই মৃত্যু পথযাত্রীর অন্তিম ইচ্ছা তারা পূরণ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। শেষে তার শেষকৃত্যও সম্পাদন করে লোকদুটি। নাট্যকার মলয় ভৌমিকের সংলাপের গাঁথুনির জোরে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার উপক্রম দর্শকের। আবার, ভাবনার জায়গাটা ক্রমে বড় করে তোলেন তিনি।

বুদে মরার আগে পানি পান করতে চেয়েছিল কিন্তু লোকদুটি তাকে বলে কূপের মধ্যে যে পানি আছে তাতে তার পেট ফুলে উঠবে। কিন্তু বিধিবাম! কূপের মধ্যে কোনো পানি নেই। পানি খেয়ে মরা তো দূরের কথা, গলার তৃষ্ণাও মেটেনি তার। কূপের তলানি থেকে শব্দ করছে সে। এবার তো আরও বড় জ্বালা! ব্যাঙ্গাত্মক নাটকের রসবোধ বেশ ভালো করেই সাজিয়েছেন নাট্যকার। রসে টইটুম্বুর ‘বুদেরামের কূপে পড়া’। সমাজের বিবেককে কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে টেনে তুলছেন নাট্যকার মলয় ভৌমিক। কিন্তু সেই টেনে তোলার আগেও কত কারিকুরি আর জারিজুরি। একটা প্রজেক্ট করতে হবে, সেই প্রজেক্ট পাস করাতে হবে, তাতে কার কী লাভ ইত্যাদি। এতকিছুর আয়োজন বেশ ভালোই চলছিল কিন্তু যেই না তার মধ্যে টিভি উপস্থাপক ঢুকে গেল আর মনে পড়ল নাট্যকারের ‘ম্যাও সঙকেত্তন’ নাটকের কথা। কতক যেন একই গতে বাঁধা।

যাহোক, বুদের বিপদ তো আর শেষ হয় না। একের পর এক বিপদে পড়ে সে। তাকে বেঁধে রেখে পেটায় ষণ্ডাপাণ্ডারা। তাতে বুদের অপরাধ যে কী, সেটা বুদে নিজেও জানে না। আর যারা বুদেকে বেঁধে পেটাচ্ছে তারাও জানে না। বুদের প্রেমিকা তাকে প্রতিবাদের কথা বললেও বুদে কোনো প্রতিবাদ করে না। 

সমাজে এই তো চলছে। প্রতিবাদ নামক শব্দটি হারিয়ে যাচ্ছে। যেখানে নিজের বিবেক কূপের মধ্যে পড়ে যায়, সেখানে আর বলার কী থাকে! নাটকটি যেন বর্তমান সমাজের এক প্রতিচিত্র। এখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখচ্ছবি মূর্তমান হয়ে ওঠে। একদল মার খাচ্ছে, আরেক দল মারছে। কিন্তু যে মার খাচ্ছে, সে জানে না কেন মার খাচ্ছে। আবার যে মারছে, সে নিজেও জানে না কেন মারছে। কেউ একজন আছে যে আসলে এই সবকিছুর কলকাঠি নাড়ে। কে সে? তাকে কেউ দেখতে পায় না।

নাট্যকার মলয় ভৌমিক নিজেই নির্দেশনার কাজটি সম্পন্ন করেছেন। সেখানে বেশি কিছু করার চেষ্টা করেননি। বেশ সাদামাটা একটা উপস্থাপন। বোঝা যায় পাণ্ডুলিপি আর অভিনেতারাই তার মূল শক্তি। পাণ্ডুলিপিতে উতড়িয়ে গেলেও যেন অভিনয়ে কোথাও কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হলেন। একই স্কেলে সংলাপ প্রেক্ষেপণের কারণে কখনো মনোটোনাস লাগছিল। মঞ্চ সাজানোর জন্য রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। নাটকের আলো সাজিয়েছেন আল জাবির। বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তার আলোর খেলায়। মনির উদ্দিন টভেলের পোশাক পরিকল্পনাও প্রশংসনীয়। রঙয়ের সঙ্গে শ্রেণি আভিজাত্যে সামঞ্জস্যতা ভালো লেগেছে।

অনুশীলন নাট্যদলের ৬৩তম প্রযোজনায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন—জিল্লুর রহমান জুয়েল, শাহাদাত হোসেন মিমসিন, খায়রুল ইসলাম, তানভির অর্ক, রায়হান উদ্দিন, রাকিবুল আলম মিলন, নবনীতা চক্রবর্তী, লিমন বিশ্বাস, স্বাধীন খাঁন।