এখনই সতর্ক হওয়া দরকার

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৪০

ড. আর এম দেবনাথ

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের প্রধানতম সমস্যা দৃশ্যত তিনটি যথা: কালো টাকা, অর্থপাচার এবং খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের খবর প্রায় প্রতিদিনই একটি না একটি কাগজে ছাপাই হয়। ‘খেলাপি ঋণ’ মানে চুক্তি খেলাপ করা ঋণ। অর্থাত্ চুক্তিতে যেভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল ঋণগ্রহীতা সেভাবে টাকা পরিশোধ করছে না। এটি হলেই খেলাপি হয় না। কোন ঋণটি কখন কীভাবে কী অবস্থায় খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হবে— তা ঠিক করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর জন্য নানাবিধ সংজ্ঞা বা ফর্মুলা আছে। খেলাপি ঋণ আবার কয়েক প্রকার। কোন প্রকারের খেলাপি হলে কত টাকা ‘প্রভিশন’ রাখতে হবে— তাও বলা আছে। এসব ফর্মুলা অঙ্কের ফর্মুলার মতো। অথচ সকল ব্যবসা শিল্প সবসময় সারা বছর অঙ্কের মতো চলে না। কখনো ভালো থাকে, কখনো মন্দ হয়। এটা নির্ভর করে নানা পরিস্থিতির ওপর। তবে একটি ঋণ খেলাপি হয় ইচ্ছাকৃতভাবে। এটাই ‘ডেঞ্জারাস’। ক্ষতিকর। এটা আদায়ের ব্যবস্থা কী? কী ব্যবস্থা অন্যান্য ঋণ আদায় ক্ষেত্রে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। একটা হচ্ছে গ্রামীণ ব্যবস্থা এবং আরেকটা হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা। প্রথমে গ্রামীণ ব্যবস্থাটির কথা বলি। বহুল কথিত ব্যবস্থা।

গ্রামের বাজার। ব্যস্ত বাজার। শত শত লোকের মধ্যে এক লোককে কয়েকজন যুবক সমানে পিটাচ্ছে। পেটানোর এক পর্যায়ে সে রাস্তায় পড়ে গেল। এটি দেখে অনেকেই দয়াপরবশ হয়ে জিজ্ঞেস করল, এভাবে পেটাচ্ছেন কেন? জওয়াব এলো, ও আমাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছে। আজ দেই কাল দেই বলে টাকা আর পরিশোধ করছে না। তাই পেটানো হচ্ছে। তখন পেটানোর ফলে আহত লোকটাকে জিজ্ঞেস করা হলো: কথাটি কি সত্যি? উত্তর এলো, সত্যি। তাহলে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না কেন? এবার জওয়াব: আজকে যেভাবে পিটিয়ে টাকা ফেরত চাওয়া হচ্ছে, সেভাবে কোনোদিনই টাকা ফেরত চাওয়া হয়নি। চাওয়া হলে আমি কবেই টাকা ফেরত দিয়ে দিতাম। এটি গ্রামে চালু কথা। কথাটির একটা সারমর্ম আছে। টাকা ফেরত চাইতে হয় শক্তভাবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের ব্যাংকগুলোর টাকা ফেরত চাওয়ার ধরন দুই রকম। দুর্বলের টাকা আদায়ে এক রকম ব্যবস্থা এবং সবলের টাকা আদায়ের আরেক ব্যবস্থা। কৃষক ঋণ নিয়ে যখন ফেরত দিতে পারে না, তখন ব্যবহার করা হয় পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি এ্যাক্ট। কত টাকা? খুবই অল্প টাকা।

দুই চার দশ বিশ হাজার টাকা। পঞ্চাশ হাজার টাকা। এই সামান্য টাকা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করে। ফৌজদারি আইনের ভিত্তিতে কৃষকের কোমরে দড়ি দিয়ে থানায় নেওয়া হয়, জেলে পাঠানো হয়। দেখা যায়, অনেকে দয়াপরবশ হয়ে এই সামান্য টাকা ব্যাংককে দিয়ে মাঝে মাঝে কৃষককে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনেন। অথচ বড় বড় ব্যবসা ও শিল্প ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় অর্থঋণ আদালত আইন। এটা সিভিল আইন, দেওয়ানি আইন। এর বিরুদ্ধে রিট করা যায়। বিচার বিলম্বিত করা যায়। অথচ তা না হলে অনেকেই টাকা ফেরত দিত। এমতাবস্থায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণের টাকা আদায়ের জন্য নরম ও গরম বার্তা দিচ্ছেন। তিনি ঋণগুলোকে দুইভাবে ভাগ করবেন: ভালো ঋণগ্রহীতা, খারাপ ঋণগ্রহীতা। ভালোরা ভালো ব্যবহার পাবেন, খারাপরা খারাপ। এটা করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য  ব্যাংকে ব্যাংকে বিশেষ অডিট করাবেন। কারা টাকা নিয়ে ব্যবসা করছে, কারা টাকা নিয়ে শিল্প করেছে তা তিনি দেখবেন। কারা টাকা নিয়ে ব্যবসা করছে না, ব্যাংকের টাকাও ফেরত দিচ্ছে না তা দেখা হবে। তিনি বলেছেন, আদায়ের জন্য আইনি সংস্কার করবেন তিনি। ভালো কথা বলেছেন একটি। ব্যাংকের টাকা মারা একটি অপরাধ। ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা। তিনি বলেছেন স্বল্প মেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ দেওয়া উচিত নয়। কারা ঋণের টাকায় যন্ত্রপাতি আমদানি করেনি, অথচ ঋণ ব্যবহূত হয়েছে— তাও দেখা হবে। কোন কোন রপ্তানিকারক মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রপ্তানির ভর্তুকি মেরে দিচ্ছে দেখা হবে তাও। খেলাপিদের ক্ষেত্রে কী ব্যবহার করা হবে তার কথা বলতে গিয়ে তিনি মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনেছেন। বলেছেন, খেলাপিরা বিদেশে যেতে পারবে না। তিনি ব্যবসায়ীদেরকে বলেছেন, ব্যবসার পরিবেশ তিনি সৃষ্টি করবেন। এ ধরনের অনেক অঙ্গীকার তিনি করেছেন। আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। তবে মোক্ষম কথা একটা বলেছেন তিনি। বলেছেন, রাজস্ব জোগাড় করে দিতে হবে। তাহলেই সবকিছু হবে। ঋণের ওপর সুদের হারও কমবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বক্তব্য একটু দীর্ঘ করেই তুলে ধরলাম। সব বিষয়ের ওপর আলোচনা করা একটা নিবন্ধে সম্ভব নয়। তবে বর্তমান অবস্থার একটা প্রেক্ষাপট তুলে ধরি। ভালো ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের (রিসিডিউলিং) একটা ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থাটি চূড়ান্তভাবে অপব্যবহার করা হয়। ১০-১২-১৫ বারও  ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। এখন আর দুই তিন বারের বেশি পুনঃ তফসিল করা যায় না। ফল হয়েছে খারাপ। দেখা যাচ্ছে, পুনঃতফসিলে আর হচ্ছে না।। করা হলো ঋণ পুনর্গঠনের কাজ (লোন রিস্ট্রাকচারিং)। সুদের হার কমানো হলো, পরিশোধের সীমা বাড়ানো হলো। গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাতেও কিছু ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানিকারক হঠাত্ ফান্ডের সংকটে পড়ল। তাকে সাহায্য করার জন্য লোন এ্যাগেইনস্ট ইমপোর্টেড মার্চেনডাইজ (এআইএম) এর ব্যবস্থা করা হলো— যাতে আমদানিকারকদের মাল ব্যাংকের গুদামে রেখে ঋণ দেওয়া যায়। এই ব্যবস্থাটিরও বারোটা বাজানো হয়েছে। পরে করা হলো ট্রাস্ট রিসিটের (টিআর) মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। টাকা নেই ডকুমেন্ট ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। ঠিক আছে ডকুমেন্ট নিয়ে নাও, মাল ছাড়াও, বিক্রি কর। টাকা ফেরত দাও। এই সুযোগটিও ব্যাংকার-কাস্টমার মিলে নষ্ট করেছে। এভাবে দেখলে বোঝা যায়, ব্যাংকের প্রত্যেকটি লোন প্রোডাক্ট অপব্যবহার করে এক সর্বনাশা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এতে এক শ্রেণির লোক পুঁজি গঠন করেছে। যাকে বলা যায়, ‘প্রাইমারি একুমোলেশান অব ক্যাপিটেল’।

বহু লোক উদারভাবে ঋণ পেয়ে যাচ্ছেতাইভাবে তা ব্যবহার করেছেন। কেউ জমি কিনেছেন, কেউ শেয়ারের ব্যবসা করেছেন। কেউ বিদেশে টাকা পাঠিয়েছেন। ফল হচ্ছে বড় বড় গ্রাহকের ঋণ বেড়েছে। তারা হয়েছে ‘ওভার বরোড কম্পানি’। যা দরকার, যা তারা পেতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ তারা পেয়ে গেছে। পাঁচ লাখ, দশ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কম্পানি ঋণ নিয়েছে শত শত কোটি টাকা—ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার। এখন হয়েছে কী, তারা আর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ‘ক্যাশ’ জেনারেট করতে পারছে না। অথচ তারা শেয়ার বাজারে যেতে পারত। সেখান থেকে পুঁজি তুললে পুঁজির কোনো স্থায়ী খরচ ছিল না। লাভ হলে লভ্যাংশ, লোকসান হলে বিনিয়োগকারীদের কিছুই দিতে হতো না। অথচ ব্যাংকের লোন মানেই সুদ, তস্য সুদ। তস্য সুদের ব্যাপার থাকলেও আমাদের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী শিল্পপতি অবিরাম ব্যাংক লোন নিয়েছেন। আর সদাশয় ব্যাংকাররা কষ্ট না করার জন্য, নতুন উদ্যোক্তা খোঁজার ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকার জন্য সব ঋণ দিয়েছে বড় বড় গ্রাহককে। এক, দুই, পাঁচ, দশ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহীতা এখন প্রচুর। অথচ ছোট ছোট ঋণের অভাব। ছোট ছোট ঋণের আদায় পরিস্থিতি ভালো। কিন্তু ব্যাংকাররা ও পথে গেলেন না। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ব্যাপারে  নির্দেশনা রয়েছে। পুঁজি গঠনে সাহায্য করতে গিয়ে অবিবেচক ব্যাংকাররা আজ পুরো ব্যাংকিং খাতকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। অবশ্য এর ফল আরেকটা আছে। দেশে শিল্প-কারখানা হয়েছে। প্রচুর লোক রপ্তানি ব্যবসা করছে। লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা অনেক বেড়েছে। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকৃত অর্থে সান্ত্বনার বিষয় হতে পারে না। খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে অর্থনীতি বেশিদিন, বেশি দূর এগুতে পারবে না।

অতএব, দুষ্টের সঙ্গে কঠোর হওয়া এখনই দরকার। আবার ঠিকই ভালো যারা তাদের সহযোগিতা করা দরকার। অবিলম্বে অডিটের কাজ শেষ করে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’দের চিহ্নিত করা হোক। দরকার বোধে এদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করে সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হোক। অবিলম্বে হাইকোর্টে ‘রিট’ করা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা হোক। অর্থ ঋণ আদালতের সংস্কারের কাজ অবিলম্বে শেষ করা হোক। জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংকিং বিভাগের কাজ নির্দিষ্ট করা হোক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হোক। সরকারি ব্যাংকগুলো লিমিটেড কম্পানি। লিমিটেড কম্পানি চলে মেমোরেন্ডাম অব এসোসিয়েশন (এমএ) এবং আর্টিকেলস অব এসোসিয়েশন (এ.এ) মোতাবেক। অতএব, এসব ব্যাংককে অন্যান্য ব্যাংকের মতো এই দুটো ডক্যুমেন্ট মোতাবেক চলার ব্যবস্থা করা হোক। বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হোক। আরও অনেক সুপারিশ আছে। ধীরে ধীরে তা পাঠকদের সামনে তুলে ধরব।

n  লেখক: অর্থনীতিবিদ। সাবেক শিক্ষক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়