মোহাম্মদ অংকন
সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গিয়েছে। প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে নানাবিধ প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সাগরপথে মানব পাচারের দুঃসহ খবর। এই মানব পাচারের শিকার হয়ে থাকে বেকার যুবক, কিশোর ও নারীরা। যখন তারা মানব পাচারের কবলে পড়ে, তখন বুঝে উঠতে পারে না যে তাদের ভবিষ্যত্ কি! যখন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অতিক্রম করা হয়, তখনই তাদের ওপর অমানবীয়, অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন চলে। নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়ায়-পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা। সোজা কথায় কাজ না হলে মৃত্যুর ভয় দেখানো হয়। অনেকাংশে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। যখন এই নির্মম পরিস্থিতির বিষয়টি পরিবার উপলব্ধি করতে পারে, তখন বাধ্য হয়ে তাদের এজেন্টদের হাতে আবদারকৃত অর্থ তুলে দিতে হয়। জীবন বাঁচাতে মানুষ কি না করে! জমিজমা, ভিটেমাটি বিক্রয় করে মুক্তিপণ দিতে হয়। এতকিছুর পরও কেউ কেউ দেশে ফিরতে পারে না, কেউ কেউ পারে। মানব পাচারের এই ধরনের ভয়ানক পরিস্থিতি সত্যই প্রমাণ করে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’ প্রশ্ন হলো— এ লোভের পথে তাদেরকে আনছে কারা?
আমি নিঃসন্দেহে বলব, সারা দেশে মানব পাচারকারীদের একটি সুবিশাল চক্র বা যোগসূত্র রয়েছে। যারা সমগ্র দেশ বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এই চক্র সাধারণ মানুষকে বৈদেশিক শ্রমের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করছে। পাচার চক্রের সক্রিয়তায় বেকার যুবক, কিশোর ও নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে নানা রকম লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক পর্যটক বা ভ্রমণকারীও তাদের জালে আটকা পড়ছে। আবার অপহরণ করেও নিয়ে যাচ্ছে অনেককে। উদ্দেশ্য মুক্তিপণ আদায় করা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশি মানব পাচারের একটি তথ্য দিয়েছিল। প্রথম তিন মাসে ২৫ হাজার বাংলাদেশি পাচারের শিকার হয়েছিল। এই তথ্যটি কি আঁতকে ওঠার মতো নয়? শুধু তাই নয়, এই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল ৩০০ জনের। তাদের বেশির ভাগ ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গিয়েছিল। মুক্তিপণের টাকা না পেয়েও অনেককে হত্যা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। মানব পাচার যে শুধু নির্দিষ্ট মৌসুম বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু ক্রমাগত মানব পাচার রোধ করা যাচ্ছে না কেন? মানব পাচার রোধে আমাদের কি কি সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে?
মানব পাচারের যেমন নানাবিধ কারণ রয়েছে, তেমনই রোধে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
উপকূলবর্তী ও সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কম থাকায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যাচ্ছে না বলে মাদক চোরাচালান, মানব পাচারের মতো রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যক্রমে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ন্যায়পরায়ণতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করছি।
আমাদের দেশের পার্শ্ববর্তী দেশ হলো ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশ থেকে ভারতে মানব পাচারের তেমন কোনো নজীর নেই। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে মানব পাচার হচ্ছে। এসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না থাকার কারণে মানব পাচার রোধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা যাচ্ছে না বলেই আমরা ধরে নিয়েছি। এই বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানের সুযোগ এখনই তৈরি করতে হবে। শুধু তাই নয়, যেসব দেশের মানুষ মানব পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদেরকে বৈশ্বিক আইনের আওতায় আনতে জাতিসংঘ, সার্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থাগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে, আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থা বর্তমানে অগ্রসরমান। মানব পাচারের প্রসঙ্গগুলো যদি আমরা সঠিকভাবে সরকারের নিকট উপস্থাপন করতে পারি তাহলে বর্তমান সরকার নিশ্চয়ই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং মানব পাচার রোধে সীমাবদ্ধতাগুলো দূরীকরণের মাধ্যমে দেশ থেকে মানব পাচার রোধ করতে সক্ষম হবে বলে আশা রাখছি।
n লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ঢাকা
