গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
কথা ছিল বিলের পানি সময়মতো নিষ্কাশিত হবে। ৫০০ একরে বোরো ও ৩০০ একরে বাড়তি রোপা-আমন হবে। বিলে পোনা অবমুক্তির ফলে ১০ কোটি টাকার মাছ উত্পাদন হবে। ২ হাজার হতদরিদ্র পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। প্রকল্পে বড় আকারের স্লুইসগেট, তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ, আধাপাকা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ এবং দু্ই দফায় খাল খনন হয়। কিন্তু দেড় দশকেও এ প্রকল্প সফলতার মুখ দেখেনি। এবারও বন্যায় বিলের ফসল ডুবে গেছে। জলাবদ্ধতায় বহু জমি এখনও অনাবাদি। অথচ স্লুইসগেট, খাল ও বাঁধ পুনঃসংস্কারের নামে কোটি টাকার নতুন প্রকল্প পাশের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এভাবেই এলজিইডির ‘দ্বিতীয় ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন সেক্টর প্রকল্প, এর ‘ডগাবিল উপপ্রকল্প’ এর দুরবস্থার বর্ণনা দিচ্ছিলেন কৃষক আব্দুস সামাদ।
জানা যায়, এলজিইডি ২০০৫ সালে উপজেলার নগদাশিমলা ইউনিয়নের ডগাবিলকে ঘিরে ৮ কোটি টাকার একটি উপপ্রকল্প গ্রহণ করে। এতে অর্থের জোগান দেয় বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের মুখবন্ধে বলা হয়, এটি বাস্তবায়িত হলে বিলডগা, লক্ষ্মীপুর, চককাশি, হাউলভাঙ্গা, চাতুটিয়া, জোতহরি, পাথালিয়া ও মজিদপুর গ্রামের ২ হাজার হতদরিদ্র পরিবারের বিলকেন্দ্রিক জীবন পালটে যাবে। তিনগুণ ফসল মিলবে। পাঁচ গুণ বেশি মাছ উত্পাদন হবে। আন্তঃযোগাযোগ গড়ে ওঠায় আট গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। ২০০৬ সালে চেরাগ খালে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। চেরাগ খাল ডগাবিল ও নালীবিলকে সংযুক্তের পর ডগাখালে মিশেছে। আর ডগাখাল মিশেছে ঝিনাই নদীতে। চক্রকারে ঘিরে থাকা এসব বিল, খাল ও নদীকে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বলে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন আনা হয়। এজন্য ডগাখালের পশ্চিম পাড়ে বিলডগা ও চককাশি গ্রামকে ঘিরে নির্মিত হয় বেড়িবাঁধ। কিন্তু বাঁধ নির্মাণে নয়ছয় করায় প্রতি বছরই বৃষ্টিবাদলে ভেঙে যায় বাঁধ। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ডগাবিলের পশ্চিমে ঝাওয়াইল-ধনবাড়ী সড়কে চাতুটিয়া ব্রিজ, আর বিলের দক্ষিণে গোপালপুর-পিংনা সড়কের মজিদপুরে রয়েছে দুটি বড় কালভার্ট। পাথালিয়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, ঝিনাই নদীর পানি ঐ তিন ব্রিজ কালভার্ট দিয়ে প্রবেশ করায় ডগাবিল প্লাবিত হয়। ফলে আগাম রোপা-আমন তলিয়ে যায়। আবার জলাবদ্ধতায় নাবি রোপা-আমন লাগানো যায় না। তিনটি ব্রিজ-কালভার্ট দিয়ে এভাবে বানের পানি ঢোকার বিষয়টি খতিয়ে না দেখেই এলজিইডি কারিগরিভাবে ভুল প্রকল্প গ্রহণ করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিলডগা গ্রামের কৃষক খাদেম আলী জানান, কয়েক কোটি টাকার স্লুইসগেট এবং বাঁধ কোনো কাজেই আসছে না। কারণ মজিদুপর এলাকার দুটি কালভার্ট বন্ধ না করায় ঝিনাই নদীর পানি অবাধে ডগাবিলে প্রবেশ করে। প্রতিবারের মতো এবারও বিলের শত শত একর রোপা-আমন বানের পানিতে তলিয়ে যায়। তার ভাষায় ডগাবিল উপপ্রকল্প এলজিইডির একটি তুঘলকি প্রকল্প। তিনি বিলে বানের পানি প্রবেশের একাধিক কালভার্ট বন্ধের দাবি জানান।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের মহিউদ্দীন জানান, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ বছর আগে অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বিলে মাছ ছাড়া হয়। কিন্তু হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালীরা বিল দখলে নামায় মাছ ধরা নিয়ে দলাদলি ও কোন্দল দেখা দেয়। বিষয়টি মামলা-মোকদ্দমায় গড়ানোয় বিলে মাছ চাষ বন্ধ হয়ে যায়। জোতহরি গ্রামের আলম হোসেন জানান, বিলের ব্যবস্থাপনা দেখাশোনার জন্য জাইকার উদ্যোগে সমবায় সমিতি গড়ে তোলা হয়। সমিতির কার্যক্রম চালানোর জন্য দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় আধাপাকা অফিস ভবন। কিন্তু নির্মাণে কারচুপির দরুন ভবনটি তিন বছরের মাথায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সমিতির কাজকর্মও এখন ঝিমিয়ে পড়েছে। নগদাশিমলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন আলী জানান, যে লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় প্রকল্প চালু হয়েছিল সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। মধ্যখানে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটেছে। বিল ব্যবস্থাপনা সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার জানান, সামনের দিনে এলাকার মানুষ প্রকল্প থেকে যাতে উপকৃত হয় সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছে এলজিইডি। সমিতির সম্পাদক শুকুর মাহমুদ জানান, এলজিইডির পরামর্শে বাঁধ, স্লুইসগেট ও চেরাগ খাল পুনঃসংস্কার প্রকল্প দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পের সফলতা নিয়ে এলজিইডি আশার বাণী শুনিয়েছে। প্রকল্প দেখভালের দায়িত্বে থাকা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের প্রকৃত লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। এ জন্য তিনি এলাকাবাসীর কোন্দলকে দায়ী করেন। উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, ডগাবিল অনেক পুরোনো প্রকল্প। এটিতে নতুন করে গতি আনার জন্য বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খোঁজখবর নেওয়ার পরই বলা যাবে প্রকল্পের সফলতা বা র্ব্যথতা কতটুকু।
