ডিজিটাল ইতিহাস বিকৃত কারা করে?

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২১:১৯

এই দেশের ইতিহাস বহুবার বিকৃত ও কলঙ্কিত করা হয়েছে। সেন রাজাদের আমল থেকে পাঠান, মোগল যুগ, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি যুগ, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশও। সেনরা ইতিহাসের পাতায় লিখতে চেয়েছিলেন, অনার্য বাঙালিরা অসভ্য। মোগল যুগেও বাঙালিদের নিয়ে মিথ্যা ইতিহাস সাজানো হয়েছিল। ইংরেজরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে মিথ্যা ইতিহাস সাজিয়ে প্রচার করেছিল, তিনি দয়ামায়াহীন এক নিষ্ঠুর। কলকাতায় ইংরেজদের কুঠি আক্রমণের পর বন্দি ২০০ ইংরেজ সৈন্যকে অন্ধকূপে বন্দি রেখে হত্যা করেছিলেন। সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে আরো রটানো হয়েছিল, ৫৬ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

এসব ছিল ইংরেজদের সাজানো মিথ্যা ইতিহাস। ইতিহাস কখনো মিথ্যা হয় না, সত্য কখনো চাপা থাকে না। হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য নিজেদের সুবিধা ভোগ করতে পেরেছিল তারা। পরবর্তীকালে বিখ্যাত বাঙালি ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় প্রমাণ করেন, সিরাজের বিরুদ্ধে অন্ধকূপ-হত্যার অপবাদ ছিল ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক রটনা আর পলাশীর যুদ্ধে নবাব পরাজিত হননি, বরং তার সেনাপতি মীরজাফর তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পলাশীর যুদ্ধের আগে সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে যুদ্ধে ইংরেজরা পরাজিত হয়ে সেনাপতি ক্লাইভসহ মাদ্রাজে পলায়ন করেছিল।

পাকিস্তান আমলে বাঙালির ইতিহাস আবারও বিকৃতি করার একই ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। বাঙালি মুসলমানদের বলা হলো তারা প্রকৃত মুসলমান নয়। তারা হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত। তাদের চালচলন, আচার-আচরণ সব হিন্দুয়ানি। তাদের ভাষা-সংস্কৃতি হিন্দুয়ানি। পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকদের এই প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য ১৯৫২ সালে বাঙালি তরুণদের রক্ত ঝরাতে হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় মোশতাক-জিয়াউর রহমান চক্রের ষড়যন্ত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ শহিদ হন এবং স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ ক্ষমতা দখল করে। তাদের একুশ বছরের শাসনামলে শুরু হয় আবার ইতিহাস বিকৃতি। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলে শুরু হয়, সেখানে ঘাতক চক্রের নায়ক জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি ‘তাহজিব-তমদ্দুন’ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সেন রাজাদের আমল থেকে পাঠান, মোগল যুগ, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি যুগ, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশও এখন তার প্রমাণ।

এখন ডিজিটাল পৃথিবী। ইতিহাস বিকৃত করা এখন আরো সহজ হয়ে গেছে। ইদানীং দৈনিক পত্রিকাগুলোতে চোখ মেললেই দেখতে পাই, কাউকে ব্যঙ্গ করে ছবি আঁকা হয়েছে, কারো কণ্ঠ হুবহু নকল করে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। যার যেমন ইচ্ছেমতো ইতিহাস নতুন করে লিখে ছাপিয়ে দিচ্ছে। ভালো মানুষদের খারাপ বানানো হচ্ছে সাধারণ জনগণের কাছে, খারাপদের ভালো। শেখ হাসিনার শাসনকালকে স্বৈরাচারী শাসন, অবৈধ শাসন, অগণতান্ত্রিক শাসনরূপে চিহ্নিত করার যে ডিজিটাল অপচেষ্টা স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ করছে তা সাবধানের সঙ্গে রুখতে হবে। দেশে ও বিদেশে শেখ হাসিনা এখন নন্দিত নারী। আশপাশের সাপ খোলস বদলিয়েছে, তাই বলে তারা যে বিষধর না তা কিন্তু নয়। তারা যে কোনো সময় ছোবল দিতে পারে। তাই সাবধান থাকতে হবে।

কিছুদিন আগে দেখলাম শেখ হাসিনার হাতে গড়া নেতা, বর্তমান গাজীপুর মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে। জাতির পিতাকে কটূক্তি করা হয়েছে বলে ঐ ভিডিওর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যেই মানুষটা ছোটবেলা থেকে জাতির পিতার আদর্শে বড় হয়েছে, যেই মানুষটা দলের জন্য জেল খেটেছে, একের পর এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। তিন বছরে গাজীপুরের চেহারা বদলে দিয়েছে, সে কীভাবে এমন বলতে পারে। তাছাড়া, ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না কিছু। আমার দেখে বিশ্বাস হয়নি। এটি নতুন কোনো ষড়যন্ত্র নয় তো?

গাজীপুর নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমি বেশ কয়েক মাস আগে এই মানুষটার কথাও বলেছিলাম আমার এক কলামে। আমি গাজীপুর শহরের মানুষের স্বপ্ন সত্যি হওয়া দেখেই বলেছিলাম। তাকে বলেছিলাম, শেখ হাসিনার রোপিত চারা গাছ এখন বড় হয়ে ফল দিচ্ছে। আমার সেই লেখায় জাহাঙ্গীর সম্পর্কে লিখেছিলাম, আমার ধারণা, শেখ হাসিনা যদি জাহাঙ্গীরের মতো দশ জন নেতাও তৈরি করে যেতে পারেন, তাহলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। শেখ হাসিনা তার কাজে খুশি হয়ে নিজেই তাকে গণভবনে ডেকে এনে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব দেন। তার নেতৃত্বে গাজীপুর আওয়ামী লীগ এখন জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জাতীয় শোক দিবসে দলের কেউ যাতে চাঁদাবাজি না করে, সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নেন জাহাঙ্গীর। শোক দিবসে কাঙালিভোজের ব্যবস্থা করেন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়েই মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের রাজনৈতিক জীবন শুরু। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি থাকাকালেই দেশের সর্ববৃহত্ গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে দেড় লাখ ভোট বেশি পেয়ে। গাজীপুরে তার যে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের প্রথম নির্বাচনেই জাহাঙ্গীর ঐ পদে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন না দিয়ে মনোনয়ন দেয় আজমতউল্লাহ খানকে। তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের কাছে। অবশেষে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোয়ন দেন। তিনি ২ লাখ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন এবং সিটি করপোরেশনকে গুছিয়ে তোলার কর্মসূচি নেন।

আমার সঙ্গে আলাপের সময় জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ‘জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা আমার অভিভাবক। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণে কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর সব নির্দেশ পালন করছি। মেয়র নির্বাচিত হয়ে গণভবনে নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি একটি চারাগাছ রোপণ করলাম। কথাটা যেন সব সময় মাথায় থাকে। এই চারাগাছ থেকে বৃক্ষ হয়ে যেন জাতিকে ফল দিতে পারি—এই দোয়া করবেন।’ শেখ হাসিনার রোপিত চারাগাছ এখন বড় গাছ হয়েছে। ফল দিচ্ছে। এটা আমার মন্তব্য।

জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গাজীপুরের উন্নত ও আধুনিক নগরায়ণে আমি বিস্মিত হয়েছি। মাত্র দুই বছর দুই মাস সময়ে নগরীর আমূল পরিবর্তন হয়েছে। চলতি বছরে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারও ইতিমধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে গাজীপুর সিটিকে। ফলে গাজীপুরের চেহারা এখন পালটে গেছে। নগরবাসীর অনেক অভাব-অভিযোগ মোচন হয়েছে।

শুধু উন্নয়নের কাজে নয়, এবার করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের সময়েও জাহাঙ্গীর আলম নগরবাসীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মহামারির শুরুতেই চীন থেকে নিজের অর্থায়নে ১ লাখ কিট আনেন বিশেষ ব্যবস্থায়। দেশের যেসব হাসপাতালে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করা হয়, সেই সব হাসপাতালে বিনা পয়সায় এসব কিট বিতরণ করেন। এখানেই শেষ নয়। মহামারির প্রথম দিকে ১ লাখ পরিবারকে ২০ দিনের খাবার পৌঁছে দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় আরো ৪ লাখ পরিবারকে ২০ দিনের খাবার পৌঁছে দেন। সিটি করপোরেশন এলাকায় আড়াই হাজার মসজিদের ইমাম ও খতিবের জন্য মাসিক সম্মানি ভাতা চালু করেছেন।

নগরের যানজট নিরসনে জাহাঙ্গীর আলমের উদ্যোগ অনুকরণীয়। যানজট নিরসনে ৩০০ ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ২৫ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন। জাহাঙ্গীর আলম একজন সত্ জনসেবকের ভূমিকা নিয়ে বর্তমানের জনপ্রিয়তা যদি ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জীবনে আরো উন্নতি করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

দেশে যখন সত্ নেতার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির মন্ত্রী, এমপি, সিটি মেয়রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছে, তখন ঢাকার অদূরে গাজীপুরে একজন সত্ রাজনীতিক ও মেয়রের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এবং বীর ভাওয়াল গাজীর দেশে হাসিনার হাতে গড়া একজন যুবনেতার আবির্ভাব দেখে মনে হয়েছে তার সম্পর্কে আমার কিছু লেখা উচিত। গাজীপুর এখন হাসিনার উন্নয়ন পরিকল্পনার ছোঁয়ায় একটি উন্নত সিটি। তার অতীতের ঐতিহ্য আধুনিক নাগরিক-নান্দিকতায় সজ্জিত।

মিষ্টি সুস্বাদু ফল দেখলে চোর, লোভীরা গাছে ঢিল ছুড়বে—এটা স্বাভাবিক। তাই বলে এভাবে? এমন একটা দায়িত্ববান মেয়রকে  ডিজিটাল ষড়যন্ত্র করে সরিয়ে দেওয়ার কারণ কী হতে পারে, তা সবারই জানা। চোরেরা ফায়দা লুটতে পারছে না, দুর্নীতি করতে পারছে না, উন্নয়ন সহ্য করতে পারছে না বলেই কি এই প্রতিহিংসার স্বীকার মেয়র জাহাঙ্গীর আলম)! চোর যখন কোনো সুস্বাদু গাছের ফল চুরি করতে পারে না, তখন  সে রাগে, ক্ষোভে সহ্য করতে না পেরে গাছটিই মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।

গাজীপুরের মেয়রের সঙ্গে এমনটি হবে না তো? আর এরা কারা? এদের খুঁজে বের করতে হবে। না হলে আবারও ইতিহাসের বিকৃত ঘটতে শুরু করবে এই বাংলায়। তাছাড়া ইতিহাসে সব সময় ভালো মানুষেরা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কতশত অসত্য, বানোয়াট ইতিহাস লিখেছিল বিরোধী অপশক্তি। তাই বলে বিশ্বের মানুষের কাছে কি জাতির পিতাকে খারাপ করতে সক্ষম হয়েছিল তারা, হয়নি। মানুষের কানে সত্য পৌঁছে দিয়েছিল জাতির পিতারই কাছের মানুষেরা। যারা দেশের জন্য কাজ করবে, তাদের যুদ্ধ করেই যেতে হবে খারাপ মানুষদের সঙ্গে।

এখন ডিজিটাল অপশক্তিরা এক হয়ে এই দেশকে, এই দেশের ইতিহাস, মর্যাদাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। এরা কারা? কোন দলের? কোন এজেন্ট? এদের মারপ্যাঁচে পড়ে যেন কোনো নির্দোষ মানুষ শাস্তি না পায়, সেই আশা করি। সামনে নির্বাচন। ডিজিটাল অপশক্তির দল নানারকমভাবে দলের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করে দিতে চাইবে। বুঝেশুনে ভালোমন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করে এসব সতর্কতার সহিত পার করতে হবে। এরা কিন্তু ভয়ংকর!

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা যেইভাবে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। যার জন্য বহু রাঘববোয়াল ধরা পড়েছে। আরো ধরা পড়বে আশা করা যায়। সেইভাবে যেন ডিজিটাল অপশক্তি অভিযান শুরু করা হয়। যেসব চোর-বাটপাড় দলের ভেতর ও বাহির থেকে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তাদের যেন খুব দ্রুত ধরা হয়। এরা পৃথিবীর শত্রু, দেশের শত্রু, জনগণের শত্রু।

লন্ডন, ১৯ অক্টোবর ২০২১