তরুণ অনুসন্ধিত্সু জেমস ওয়াট একদিন আগ্রহভরে দেখছিলেন পানি ফোটানোর সময় কেটলির মুখ বাষ্পের চাপে বারবার ওঠানামা করছে। ছোট্ট এই ঘটনাই প্রথম শিল্পবিপ্লবের পর্দা উন্মোচন করেছিল। ১৭৬৯ সালে জেমস ওয়াট স্টিম ইঞ্জিনের মাধ্যমে বাষ্পের সেই শক্তিকে রূপ দিয়েছিলেন গতিশক্তিতে। প্রথম দিকে স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহার হতো কয়লা খনির পানি নিষ্কাশনের কাজে। এরপর কয়লা পরিবহন (রেলের ক্ষুদ্র সংস্করণ) এবং বাষ্পচালিত গাড়িতে। পরবর্তী সময় বাষ্পের সেই গতিশক্তি পৌঁছে যায় ইংল্যান্ডের কাপড়ের কারখানায়; আর হঠাত্ করেই উত্পাদন বৃদ্ধি পায় আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো। ব্রিটিশদের সেই জাদুরকাঠির ছোঁয়া চলে আসে পরে ভারতীয় উপমহাদেশেও। ইংল্যান্ডের কাপড়কলগুলোর বিপুল উত্পাদনের কাঁচামাল জোগান দিতে প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিমাণ নীলের।
সেই প্রেক্ষাপটেই উপমহাদেশের কৃষকদের বাধ্য করা হয় নীল চাষ করতে। নীল চাষ নিয়ে পরবর্তী সময় সৃষ্টি হয় মর্মান্তিক নীল বিদ্রোহের, দীন বন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ নাটকে আমরা জানতে পারি সে সময়ের প্রেক্ষাপট। প্রথম শিল্পবিপ্লব পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল আশ্চর্য রকম দ্রুতবেগে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব মূলত গড়ে ওঠে বিদ্যুত্শক্তির ব্যবহার এবং শিল্পযান্ত্রিকতার ওপর ভিত্তি করে। ১৮৭০ সালের দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে প্রায় ১০০ বছর পর ১৯৬৯ সালে মানবসভ্যতা দেখা পায় তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের। তৃতীয় শিল্পবিপ্লব গড়ে ওঠে আধুনিক কম্পিউটার, ট্রানজিস্টর ব্যবহারের ফলে ক্ষুদ্র ও সস্তা মূল্যের ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আমরা এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের গ্রহণকাল চলছে। প্রথম শিল্পবিপ্লবে মানবসভ্যতা যতখানি দৃশ্যমান হয়েছিল, পরের দুটি শিল্পবিপ্লব সেই তুলনায় অনেকটাই নিভৃতে কাজ করে বদলে দিয়েছে বিশ্বকে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি কেবল যান্ত্রিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং জৈবপ্রযুক্তি এবং মানবীয় বুদ্ধিমত্তাকে যন্ত্রের সঙ্গে সংমিশ্রণের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের একটি বড় শঙ্কার দিক হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশনের কারণে কর্মবাজারে সাধারণ মানুষের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষ রোবট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারাতে পারে। এসব চাকরির বেশির ভাগই শ্রমনির্ভর। কর্মবাজারের এই পরিবর্তনের কারণে সব থেকে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। এসব দেশের অর্থনীতি এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহ মূলত দাঁড়িয়ে আছে শারীরিক শ্রমনির্ভর নানা পেশাকে কেন্দ্র করে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশনের কারণে অনুন্নত বিশ্বের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স, দুই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কর্মবাজারে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে কেন্দ্র করে নতুন যেসব পেশার সৃষ্টি হবে, তা করায়ত্ত করার মতো শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকবে না অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর। ফলে পূর্বেকার শিল্পবিপ্লবগুলোর মতোই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব জন্ম দেবে বৈশ্বিক বৈষম্যের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের। তবে নতুন এই বৈষম্য হবে আগের তুলনায় আরো বেশি ভয়াবহ। ওয়ার্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানবসভ্যতায় অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ বয়ে আনলেও জন্ম দেবে প্রকট কিছু সমস্যা। তারা এমন ২৯টি সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে, যার ভেতরে রয়েছে বেকারত্ব, অর্ধ-বেকারত্ব, আয়ের বৈষম্য, নৈতিকতার সংকট, সামাজিক ভারসাম্যের বিনাশ ইত্যাদি। ইতিপূর্বের শিল্পবিপ্লবগুলো কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি জন্ম দিতে চলেছে জৈবিক বৈষম্যের। বায়ো-টেকনোলজির উন্নয়নের ফলে উন্নত দেশগুলো সুযোগ পাবে ‘ডিজাইনার বেইবি’ জন্ম দেওয়ার সুযোগ। ইউরোপের কোনো দম্পতি তাদের পছন্দমতো অসুখ-বিসুখ বিহীন, আকর্ষণীয় দৈহিক কাঠামোর সন্তান জন্ম দেবার সুযোগ পাবে জিন এডিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে। অসুখ হলেও জিন থেরাপি , ডিএনএ নির্ভর পার্সোনালাইজড মেডিসিন অথবা থ্রিডি বায়ো প্রিন্টারের মাধ্যমে লিভার, হার্ট কিংবা কিডনির মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রাপ্তির মাধ্যমে আরোগ্য লাভ এবং দীর্ঘায়ু প্রাপ্তি সম্ভব হবে। উচ্চ পর্যায়ের এসব ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নাগালের বাইরে থাকবে অনুন্নত বিশ্বের মানুষের কাছে। এআই, রোবটিক্স জিন এডিটিং ইত্যাদি প্রযুক্তি উন্নত দেশগুলোর মানুষদের প্রতিনিয়ত ‘সুপার হিউম্যান’-এ পরিণত করবে। অপরদিকে অনুন্নত বিশ্ব, যারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না তাঁদের গল্প পুনরাবৃত্ত হবে শত শত বছর ধরে চলতে থাকা বৈষম্যের চালচিত্র হিসেবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য ১১টি প্রযুক্তিকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞগণ, এদেরকে বলা হচ্ছে ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তি। এই ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তি কম্পিউটারকে করে তুলবে মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান, এককালের বুদ্ধিহীন যন্ত্র পরিণত হবে মানুষের মতো আবেগ, অনুভূতি আর সৃষ্টিশীল সত্তায়। এসব প্রযুক্তিতে অনেক বিষয় আলোকপাত করা হলেও ‘নৈতিকতা’ বিষয়টি রয়ে গেছে অন্ধকারে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন ২০ বা ৩০ বছর আগে তাদের ছাত্রদের মধ্যে যে মানবিক সহমর্মিতা ছিল এখন তা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গিয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে সহানুভূতি হ্রাস পাওয়ার হার ছিল প্রচণ্ড। প্রযুক্তি আমাদের অকল্পনীয় দ্রুতবেগে এগিয়ে নিলেও প্রতিনিয়ত আমরা আবর্তিত হচ্ছি আরো বড় মানবিক বিপর্যয়ের বৃত্তে। ইউভ্যাল নোয়া হারারির বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘কারাগারের দেওয়াল’ হিসেবে। মানবসভ্যতা যেন প্রতিনিয়ত ছোট কারাগার থেকে বের হয়ে আরো বড় কোনো কারাগারে প্রবেশ করছে। লেখাটি শেষ করব ওয়ার্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শয়াবের একটি উক্তি দিয়ে, তিনি তার লেখা ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ বইতে বলেছেন, ‘প্রযুক্তি অসুখ-বিসুখ দূর করবে। শরীরের নষ্ট টিস্যু মেরামত করে দেবে, ভালো কথা; কিন্তু প্রযুক্তি কী আমাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে?’
n লেখক :প্রকৌশলী ও কলাম লেখক
