আমাদের দেশের দুই-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারের চেয়ে কম উচ্চতা ও হিমালয়ের পাদদেশে হওয়ায় এবং অসংখ্য নদ-নদী থাকায় ঘনঘন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে পানির উত্স হচ্ছে দূষিত। আবার জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অধিক সংখ্যক মানুষের শহরমুখিতা ইত্যাদি কারণের কথাও বলতে হয়। অল্প বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এর ফলে পানি দূষিত হচ্ছে; মানুষ চরমভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকটে ভুগছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসে শহরের আবর্জনায় পানি দূষিত হচ্ছে। ফলে পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব প্রকট আকার ধারণ করছে। শিল্পবর্জ্যের কারণে পানিতে বিষাক্ত ধাতু যুক্ত হচ্ছে। সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে মাটিতে থাকা ভারী ধাতুগুলো পানিতে মিশে যাচ্ছে। ফসল চাষের জন্যে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধিও পানির উত্সকে দূষিত করছে।
আমাদের উন্নয়নশীল দেশে পানি দূষণ একটি মারাত্মক সমস্যা। বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা খুব সহজে ও অল্প খরচেই পানি পরিশোধন করতে পারি।
শেওলার মাধ্যমে পানি পরিশোধন : দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রঙের প্রচুর শেওলা জন্মে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমির ঢালের লেকে জন্মানো শেওলা লেকের পানি পরিষ্কার রাখে। এইসব শেওলা দিয়ে আমরা সহজেই পানি পরিশোধ করতে পারি। সম্প্রতি ‘স্ক্যানেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল টোটাল প্যাথোজেন রিমোভাল ফিল্টার পেপার ফর ফয়েন্ট অব ইউজ ড্রিংকিং ওয়াটার পিউরিফিকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদ আলফেসানী, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারা বেগম, গবেষক ড. শারমিন জামান এবং সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজির অধ্যাপক আলবার্ট মিহরানিয়ান বলেন যে ‘পিথোফোরা’ গোত্রের শেওলা দিয়ে দূষিত পানি পরিশোধন করা যায়। এটির দ্বারা পানিতে থাকা বিভিন্ন ময়লা ক্ষতিকর উপাদান, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস পরিশোধন করা সম্ভব। যা কি না পানিকে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ করে এবং পানিতে থাকা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এমনকি ২৭-২৮ ন্যানোমিটারের ক্ষুদ্র ভাইরাসও পারিশোধন করে। এই জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যার ফলে পানিবাহিত কলেরা, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো রোগগুলোর প্রতিরোধ সম্ভব। আবার পানিতে জন্মানো এডিস মশার প্রাদুর্ভাবও অনেকাংশ হ্রাস করা যায়। এই জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে তুরাগ নদ ও ধানমন্ডির লেকের পানি পরিশোধন পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে।
ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদের মাধ্যমে পানি পরিশোধন : অনেক সময় নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, লেক ও সমুদ্রের পানিতে নানাধরনের তৈলপদার্থ মিশ্রিত হয়। পানিতে থাকা কারখানার বর্জ্য পদার্থ, গৃহস্থলির বর্জ্য এবং লঞ্চ ও জাহাজ দুর্ঘটনায় তৈলাক্ত পানি পরিশোধনের জন্য আমরা ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহার করতে পারি। এই উদ্ভিদ জলাশয়ের কাছে বাড়ে এবং অনেক সময় জলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি জার্মানির কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (টিআইকে) এবং বন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল জার্মান গবেষক পরীক্ষা করে দেখেন যে ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ সমুদ্রের তৈলাক্ত পদার্থ শোষণ করতে সক্ষম। বাংলাদেশে এই জাতীয় উদ্ভিদ প্রচুর জন্মে, এটি ব্যবহার করে আমরাও খুব সহজে পানি পরিশোধন করতে পারব—যাতে আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি জলবায়ু বিষয়ক জাতিসংঘের প্যানেলের গবেষণা বলছে, প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ২০ ভাগ বিশুদ্ধ পানি কমে যাচ্ছে। আর এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৪০ ভাগ বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দেবে। এই বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট থেকে বঞ্চিত মানুষের বাঁচার একমাত্র উপায় হতে পারে জৈব প্রযুক্তি।
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
