সকালে গিয়ে সারা দিন একটু প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে রাতে ফিরতে চান? কিংবা এক দিনের ছুটি পেয়ে কাছে কোথাও ঘুরে আসতে চান? তাহলে গাজীপুরের টুরিস্ট স্পটগুলো আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। রাজধানীর খুব কাছেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে একটু শান্তির স্পর্শ পেতে এখানকার টুরিস্ট স্পটগুলোর জুড়ি মেলা ভার।
নক্ষত্রবাড়ী: গাজীপুরে বেসরকারি রিসোর্টগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যমণ্ডিত ‘নক্ষত্রবাড়ী’। নক্ষত্রবাড়ী প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অতি জনপ্রিয় নাম। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, পুকুরের পানির ওপর কাঠ-বাঁশের সমন্বয়ে নির্মিত ১১টি কটেজ। যার বারান্দায় বসে রাতের জোছনা বা পূর্ণিমা দেখা যায়। শুধু তাই নয়, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে, অতি সৌন্দর্যের কটেজ এগুলো। পুকুরের পশ্চিম পাশের পানির ওপর গজারিগাছ দিয়ে নির্মিত এসব কটেজ। কটেজগুলোর ওপর রয়েছে ছনের ছাউনি। রয়েছে সুইমিং পুল। রয়েছে একটি বিল্ডিং কটেজ। আর খাবারে রয়েছে দেশি-বিদেশি সব ধরনের আয়োজন। পানির ওপর কটেজগুলো ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ১০ হাজার ৭৫২ টাকা। বিল্ডিং কটেজের ভাড়া ৮ হাজার ২২২ টাকা এবং টু-ইন বেড ৬ হাজার ৯৫৮ টাকা। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৫০০ টাকা। নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে করে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে ঢাকা-কাপাসিয়া মহাসড়কের রাজাবাড়ী বাজারে নামতে হবে। পরে রাজাবাড়ী বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে চিনাশুখানিয়া গ্রামের বাঙালপাড়া এলাকায় নক্ষত্রবাড়ীর অবস্থান, যা কাপাসিয়া-শ্রীপুরের সীমানা বেষ্টিত এলাকা।
ছুটি: ছুটি রিসোর্টে রয়েছে নৌভ্রমণের ব্যবস্থা, বিরল প্রজাতির সংরক্ষিত বৃক্ষের বনে রয়েছে টানানো তাঁবু। ছনের ঘর, রেগুলার কটেজ, বার্ড হাউজ, মাছ ধরার ব্যবস্থা। আর ভরা পূর্ণিমা হলে তো কথাই নেই। রিসোর্টের নিয়ম অনুসারে চাঁদনী রাতে বিদ্যুতের আলো জ্বালানো হয় না। ৫৪ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এই রিসোর্ট। ছুটি রিসোর্টের বড় আকর্ষণ ফিশিংয়ের ব্যবস্থা। আগত দর্শনার্থীরা ভেতরের লেকে ইচ্ছেমতো মাছ শিকার করতে পারবেন। আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠ রয়েছে। এসি, নন-এসি ২১টি কটেজ রয়েছে। এখানে দুই ধরনের থাকার ব্যবস্থা আছে। কটেজগুলো ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। কনফারেন্স রুম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং পিকনিকের জন্য ১০০ থেকে ২০০ জনের ভাড়া ৯০ হাজার টাকা।

যেভাবে যাবেন: প্রথমে গাজীপুরের চৌরাস্তায় আসতে হবে। সেখান থেকে নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে করে গাজীপুর ডিসি অফিসের সামনে (রাজবাড়ী)। সেখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পূর্বে আমতলী বাজার থেকে একটু উত্তরে সুকুন্দীতে ছুটি রিসোর্টের অবস্থান।
অঙ্গনা: অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়ায় এই রিসোর্টের নামকরণ করা হয়েছে ‘অঙ্গনা’। গ্রামীণ সৌন্দর্যের বেসরকারি রিসোর্ট অঙ্গনা ১৮ বিঘা জমির ওপর। যার অবস্থান গাজীপুরের কাপাসিয়ার সূর্যনারায়ণপুর গ্রামে। ভাওয়াল পরগনার লালমাটির পাহাড়বেষ্টিত এই রিসোর্ট। প্রাকৃতিকভাবে সাজানো বাগান। এখানে রয়েছে দুটি খেলার মাঠ, রয়েছে দুটি বিশালাকার পুকুর। সুইমিং পুল, একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট ও একটি পার্কও রয়েছে এখানে। বাংলোয় ১৪টি কক্ষ রয়েছে। কটেজগুলোর প্রতি কক্ষ ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ৫ হাজার টাকা। পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য পুরো অঙ্গনার ভাড়া ৭০-৮৫ হাজার টাকা।

যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে ঢাকা-কাপাসিয়া মহাসড়কের পাবুর রাস্তা নামক স্থানে নামতে হবে। পরে পাবুর রাস্তার মোড় থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে সূর্যনারায়ণপুর গ্রামে অঙ্গনার অবস্থান।
সোহাগপল্লি: ১১ একর উঁচু-নিচু জমিতে সবুজে ঘেরা এই রিসোর্টের অন্যতম আকর্ষণ হলো জলাশয়ের ওপর নির্মিত অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত ঝুলন্ত সাঁকো। জলাশয়ের পূর্ব পাশে রয়েছে একটি দ্বিতল রেস্টুরেন্ট। রয়েছে লেক। কটেজগুলো এমনভাবে নির্মিত, দেখতে মনে হয় যেন ইতালির রোম শহরের একটি সাজানো গ্রাম। কটেজগুলোর ঠিক সামনে দিয়ে বয়ে গেছে লেক। রয়েছে একটি সুইমিং পুল আর কনফারেন্সের জন্য একটি হলরুম। এই রিসোর্ট দেখতেও অনেক দর্শনার্থী আসে। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।

যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা মোড়ে নামতে হবে। পরে চন্দ্রা মোড় থেকে চার কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে কালামপুর গ্রামে সোহাগপল্লির অবস্থান।
ড্রিম স্কয়ার: গাজীপুরের মাওনার অজহিরচালা গ্রামে ‘ড্রিম স্কয়ার’ নামে বিশালাকৃতির বেসরকারি রিসোর্ট রয়েছে। ১২০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ড্রিম স্কয়ার রিসোর্ট। এর প্রধান আকর্ষণ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজের সমারোহ। রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশালাকৃতির কয়েকটি লেক। রয়েছে ১৬টি ছোট-বড় পুকুর। এখানে নানা প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রম রয়েছে। ড্রিম স্কয়ারে প্রতি বছর শীতের সময় অতিথি পাখির মেলা বসে। আছে একটি রেস্টুরেন্ট, রয়েছে ওয়াই-ফাই সুবিধা। এখানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা। এখানে ২০টি উন্নতমানের কটেজ রয়েছে। এখানে টু-ইন কেবিন, টেরাস, অনার্স, গ্রিন, ইকো এমন বিভিন্ন মানের কটেজ রয়েছে। পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ৫০ জনের জন্য জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা। ৫০ জনের অধিক হলে জনপ্রতি কম টাকা। ডিলাক্স কটেজ ভাড়া ৪০ হাজার আর রেগুলার কটেজ ভাড়া ৬ হাজার ৩২৫ টাকা।

যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে মাওনা যেতে হবে। মাওনা থেকে পশ্চিমের রাস্তা দিয়ে একটু সামনে গিয়ে উত্তরে সাড়ে ৫ কিলোমিটার যেতে হবে। সেখানে গেলেই চোখে পড়বে ড্রিম স্কয়ার।
রাঙামাটি: রাঙামাটি নাম শুনে হয়তো অনেকের মনে হবে এটি পার্বত্য এলাকার রাঙামাটি জেলা। আসলে এই রাঙামাটি সেই রাঙামাটি নয়, এটি ঢাকার পাশে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বেসরকারি একটি রিসোর্টের নাম। রাঙামাটি নাম রাখা হলেও এখানে রাঙামাটির মতো পাহাড়-পর্বত নেই। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকের চোখ ভরিয়ে দেয় মুগ্ধতায়।
কালিয়াকৈরের সিনাবহ এলাকার ভাওয়াল শালবনের ভিতর বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে রাঙামাটি রিসোর্ট। ৬০ বিঘা জমির ওপর রয়েছে বড় বড় ফুলের বাগান। সাতটি কটেজ, একটি সুইমিংপুল ও লেক রয়েছে শিশুদের থ্রি-ডি বিনোদনের ব্যবস্থা। বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, ঔষধি, বনজ গাছের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে রাঙামাটি রিসোর্ট। ভিতরে একটি লেক রয়েছে। এই লেকের মধ্যে একটি কাঠ-বাঁশের ঝুলন্ত সাঁকো রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে বেশি।
ভাড়া: কটেজের প্রতি কক্ষ ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা। পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভাড়া ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা মোড়ে নামতে হবে। পরে চন্দ্রা মোড় থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে সিনাবহ গ্রামে রাঙামাটির অবস্থান।
সাবাহ গার্ডেন: সাবাহ গার্ডেন রিসোর্ট। দেশের একমাত্র রিসোর্ট এটি যেখানে রয়েছে একটি লাইব্রেরি। বিশ্বের নামি-দামি লেখকের বই রিসোর্টটিকে ভিন্ন রূপ এনে দিয়েছে। এখানে রয়েছে গ্রামের মাটির ও টিনের ঘর। ৩৬ বিঘার ওপর নির্মিত এই রিসোর্টের বিভিন্ন লোকেশনে রয়েছে বড় বড় মনীষীদের প্রতিকৃতি। রয়েছে সৌন্দর্যমন্ডিত কয়েকটি কটেজও। রয়েছে ছয়টি ছোট-বড় পুকুর। রয়েছে বাঘ, হাতিসহ কয়েকটি প্রাণির প্রতিকৃতিও। বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, ঔষধি, বনজ গাছের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সাবাহ গার্ডেন রিসোর্ট। এর প্রধান আকর্ষণ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজের সমারোহ।
ভাড়া: পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা।

যেভাবে যাবেন: গাজীপুরের বাঘেরবাজার এলাকায় পৌঁছলে সহজেই এখানে আসতে পারবেন। নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘেরবাজার আসতে হবে।
সী গাল: সী গাল রিসোর্টটি গাজীপুরের মাওনা এলাকার সিংগারদিঘি গ্রামে ৪২ বিঘা সমতল জমির ওপর নির্মিত। এখানে ১৮টি কটেজ ও একটি লেক রয়েছে। রয়েছে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা, কনফারেন্স রুম ও খাবার হোটেল রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, ঔষধি, বনজ গাছের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সী গাল রিসোর্ট। রয়েছে একটি খেলার মাঠ। এখানে আপনি চাইলে নিভৃতে সময় কাটাতে পারেন।
ভাড়া: কটেজগুলোর প্রতি কক্ষ ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া পড়বে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে করে ঢাকা চৌরাস্তা পেরিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে উঠতে হবে। এই মহাসড়ক ধরেই মাওনা চৌরাস্তায় পৌঁছাবেন। সেখান থেকে ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সিংগারদিঘি গ্রামে সী গাল রিসোর্টের অবস্থান।
আনন্দ: গাজীপুরের কালিয়াকৈরের পরিচিত রিসোর্ট হলো ‘আনন্দ’। আনন্দ রিসোর্টটি নামের সঙ্গে বেশ আবেগের মিল রেখেছে। আনন্দদানের সব উপকরণই এখানে জোগাড় করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু চোখে দেখে নয়, বরং বিভিন্ন খেলার রাইডে চড়ে আনন্দের দেখা মিলবে এখানে। এখানে সরাসরি বিল থেকে মাছ শিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ছোটদের খেলার নানা উপকরণ। একটি সুইমিংপুল রয়েছে। ৪২ বিঘা উঁচু-নিচু টিলা ভূমিতে গড়ে তোলা হয় আনন্দ রিসোর্ট। কালিয়াকৈরের সিনাবহের তালতলি এলাকায় এর অবস্থান। বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ গাছ ও ছয়টি কটেজ রয়েছে এখানে।
ভাড়া: কটেজগুলোর প্রতিকক্ষ ২৪ ঘণ্টার ভাড়া ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। পিকনিক বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া পড়বে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
যেভাবে যাবেন: নিজস্ব পরিবহন বা যাত্রীবাহী বাসে গাজীপুরের চৌরাস্তা হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উঠতে হবে। এই মহাসড়ক ধরে সফিপুর বাজার যেতে হবে। সেখান থেকে ২ কিলোমিটার উত্তরে সিনাবহ বাজারের পাশে এই রিসোর্টের অবস্থান।
