পৃথিবীর একটি শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সারমর্ম হইল, তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পূর্ব এশিয়ার একটি অঞ্চলে হামলা চালাইলে তাহারা সেই অঞ্চল বা ভূখণ্ডকে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিবে। সেই ভূখণ্ড নিজেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলিয়া দাবি করিলেও হুমকি প্রদানকারী দেশটি তাহাকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ বলিয়াই মনে করে। সম্প্রতি সেই ভূখণ্ডের আকাশে প্রতিবেশী দেশটির অনেক যুদ্ধবিমান পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হইয়াছে। এখন প্রশ্ন হইল, সেই ভূখণ্ড রক্ষা করিতে কেন যাইবে হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশ? এই ক্ষেত্রে সাহায্যের প্রতিশ্রুতিদানকারী দেশটির ইতিহাস কী বলে? তাহারা কি ভিয়েতনামে মুখ রক্ষা করিতে পারিয়াছিল? ১৯৫০-৫৩ পর্যন্ত কোরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাহারা কি কোরিয়াতেও শান্তি আনিতে পারিয়াছিল? বরং ইহার জের ধরিয়া কোরিয়া কি দুই টুকরা হইয়া যায় নাই?
শুধু সেই দেশ কেন? তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি দেশও কি আফগানিস্তানে টিকিয়া থাকিতে পারিয়াছিল? সেখানে তাহাদের কি নাকানিচুবানি খাইতে হয় নাই? এই সকল পরাশক্তি যদি গডফাদারের বৈশিষ্ট্যযুক্ত হইত, তাহা হইলে তাহারা হয়তো-বা তাহাদের উদ্দেশ্য হাসিল করিতে পারিত। গডফাদার যেমন নিজের পরিকল্পনামতো অনেক কিছু ঘটাইবে, কিন্তু তাহাকে ধরাছোঁয়া যাইবে না; পরাশক্তিধররাও থাকিবে ঘটনার অন্তরালে। সেই প্রতিশ্রুতিদানকারী দেশ এখন গডফাদারের মতো বৈশিষ্ট্য ধারণ করিতে পারে কি না, তাহা লইয়াও সংশয় রহিয়াছে। কেননা, তাহারা নিজের দেশেই ঠিকমতো বিল পাশ করিতে পারে না। অবকাঠামো বিল পাশ করিবার কথা গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আগেভাগে। ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের এই বিল পাশ হইলে সেই দেশে কয়লার পরিবর্তে সোলার প্যানেলসহ স্বচ্ছ জ্বালানি ব্যবহারের হার বাড়িবে। বলা হইতেছে, এই বিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিশেষ উপকারে আসিবে; কিন্তু নিজ দলের নেতাদের সহিত ঐকমত্যে পৌঁছাইতে না পারায় তাহারা এখনো এই বিল পাশ করিতে পারে নাই। তাহা ছাড়া বর্তমানে দেশটির যেই সকল পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরা হইতেছে, তাহাতে উন্নয়নশীল বিশ্বের লোকেরাও বিস্মিত না হইয়া পারে না। করোনা পরিস্থিতিতে দেশটিতে যেই অবস্থা তৈরি হইয়াছিল, তাহাতে স্বাস্থ্য খাতের কথা না বলাই উত্তম। এই অবস্থায় পূর্বে নিজেকে রক্ষা না করিয়া অন্যকে রক্ষা করিবার কাজে মনোনিবেশ করা কি এতটাই জরুরি?
প্রাকৃতিকভাবে সেই দেশ সুরক্ষিত। তাহা হইলে তথাকথিত শান্তি প্রতিষ্ঠা বা রক্ষার নামে কেন অন্য দেশে হস্তক্ষেপ করা হইবে? অবশ্য যাহাকে রক্ষা করিবার কথা বলা হইতেছে, তাহার সহিত সেই দেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকিলেও একটি অ্যাক্টের মাধ্যমে তাহার সহিত সম্পর্ক রক্ষা করা হইতেছে। এই সম্পর্কের বড় দিক হইল অস্ত্র ব্যবসা। কেহ অস্ত্র কিনিয়া থাকিলে তাহাকে রক্ষা করা নৈতিক কারণে কতটা দোষের বা অদোষের হইবে তাহা অবশ্য ভিন্ন কথা। তবে আসল কারণ হইল সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ। আলোচিত ও কথিত এই দেশ দক্ষিণ চীন সাগরের একটি দ্বীপ বটে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই সাগরের বাণিজ্যিক রুটের ভূমিকা অপরিসীম। আর প্রাগৈতিহাসিক কাল হইতে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি চলিয়া আসিতেছে; কিন্তু আফগানিস্তানে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থ ব্যয় করিয়া কি কোনো লাভ হইয়াছে? ইতিহাসের নির্মম সত্য হইল, আমরা কেহই ইতিহাস হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতেছি না!
