ব্রিটিশ-আমেরিকান স্ক্রিপ্টরাইটার ও টেলিভিশন প্রযোজক জনাথন নোলানের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো—প্রত্যেক ব্যক্তিরই একটি আয়নার প্রয়োজন, যেন সে জানতে পারে প্রকৃতপক্ষে সে কে। হলিউড কাঁপানো এই নির্দেশক কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহার করলেও পৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ তাঁর এ উক্তির গভীরে যাওয়ারও সাহস করেন না।
স্পেকট্রোফোবিয়া নামক মানসিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত এসব মানুষকে আয়নায় যখন তাদের নিজস্ব চেহারা দেখানো হয়, তখন তার আত্মা ভূত হয়ে তার সামনে আবির্ভূত হয়েছে ভেবেও ঐ ব্যক্তি ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে থাকে।
আগে বলিভিয়ায় এক ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত ছিল যে, এক বছরের কমবয়সি শিশু এবং বিয়ের সাজে কনেদের আয়না দেখানো যাবে না। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে, যেহেতু শিশু বা কনের কেউ আগে তাদের এই রূপে কোনোদিন দেখেনি তাই তাদের প্রতিফলন দেখালে তারা মারা যেতে পারে। এমনকি কেউ মারা গেলে তাদের বাড়ির আয়নাটি ঢেকে রাখা হতো যাতে শোকগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রতিফলন দেখতে না পায়। তাদের বিশ্বাস ছিল এমন পরিস্থিতিতে আয়না দেখলে অতিশীঘ্রই তাদের মৃত্যু ঘটতে পারে।
প্রাচীনকালে মানুষ হ্রদ ও নদীর স্থির জলে তাদের প্রতিফলন দেখে এটি ধারণা করত যে মৃত্যুর আগেও আত্মা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আর এ ধারণার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন প্রাচীন লোককাহিনি থেকে। তাদের মতে একটি ভাঙা আয়না জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে।
এখনো অনেক সংস্কৃতিতে একটি আয়না ভাঙা মানে সাত বছরের দুর্ভাগ্য হিসেবে ধরা হয়। অনেক আফ্রিকান উপজাতি অন্ধকার জলে নিজের প্রতিফলনকে আত্মার মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করে। তারা এই ধরনের জলের দিকে তাকানো এড়িয়ে চলে এই ভেবে যে কুমির বা অশুভ আত্মা তাদের প্রতিফলন দেখে তাদের আত্মা কেড়ে নিয়ে তাদের হত্যা করতে পারে।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান নিছক আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে ভয় পাওয়ার বিষয়টিকে আয়না ফোবিয়া না বলে এটিকে স্পেকট্রোফোবিয়া বা আয়না ফোবিয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। স্পেকট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম, আচার-ব্যবহার অন্য কোনো বস্তু বা কোনো ব্যক্তির মধ্যে প্রতিফলিত হওয়ার ভয়েও সর্বদা তটস্থ থাকে। যেমন আক্রান্ত ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জবাবদিহিতা করার সময় অস্বাভাবিক কাঁপুনি, ঘাম, হূদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং আতঙ্কিত অনুভব করতে পারে এটা ভেবে যে তার প্রতিবিম্ব মনোজগতে অঙ্কিত হচ্ছে ঐ সময়ে তার মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথার সূত্র ধরে।
বিরল এই ফোবিয়া বা ভয়ের লক্ষণগুলি ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয় বলে উপসর্গগুলি অনুভব করা আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়। তবে এ ফোবিয়াটি ব্যক্তিজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে মত দেন চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা।
চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের ভাষ্য—কোনো ব্যক্তিকে স্পেকট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত হিসেবে সাব্যস্ত করার আগে সুনির্দিষ্ট ফোবিয়া, উদ্বেগজনিত ডিসঅর্ডার এবং এ দুইয়ের ওভারল্যাপিং উপসর্গ এসব কিছুই আমলে নিতে হবে এবং ভিন্ন কোনো মানসিক স্বাস্থ্যব্যাধি দ্বারা একে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
শাহাদাত সুমন
