পৃথিবীর পথে পথে কত রস-বিরস

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২২:১৪

জাপানে আমার এক বন্ধু ছিল ইথিওপিয়ার। একদিন গল্পে গল্পে আমি ওকে বলছিলাম, ‘আসলে আমি কালো তো, তাই জাপানিজদের থেকে আমাকে খুব সহজেই আলাদা করা যায়।’ আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া। বন্ধুটি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘তুমি নিজেকে কালো বলছো কেন? তুমি তো ফেয়ার।’

ভাবলাম আমার এ বন্ধুটি নিজে একটু ফরসা হওয়ার জন্য আমাকে ফেয়ার বলে বলছে, যাতে আমিও তাকে ফেয়ার চামড়ার বলি। আমি বললাম, ‘কী বলো তুমি! আমি কি কালো নই?’

ও বলে, ‘না তুমি কালো নও। কালো যে কেমন কালো হয়, তুমি তেমন কালো দেখো নাই।’

পৃথিবীর নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে আমি আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাতে থিতু হয়েছি। লুইজিয়ানা যখন ফরাসি কলোনি ছিল তখন ফরাসিরা নিউ অরলিন্সের বন্দর দিয়ে এই সোয়াম্প স্টেটে ভাষা এনেছে, ফরাসি আর্কিটেকচার এনেছে, ওদের নিজস্ব মিউজিক এনেছে, ওদের ধর্ম এনেছে, আর আফ্রিকা থেকে ধরে এনেছে শত শত ক্রীতদাস। লুইজিয়ানার জনগণের একটা বিশাল অংশ সেই আফ্রিকান আমেরিকান। এখানে না এলে আমি বুঝতামই না মানুষের চামড়া কত রঙিন! নেইবারহুডের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। অন্য দিক থেকে একটা কালো রঙের এসইউভি এগিয়ে আসছে। গতিটা একটু বেশি মনে হচ্ছিল, তাই গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দিকে তাকিয়েছি—কে চালায় দেখার জন্য। পোলাপানরা আজকাল অনেক জোরে গাড়ি চালায়, নিয়মকানুন মোটে মানতে চায় না। তাকিয়ে মোটামুটি টাশকি খেলাম। ড্রাইভিং সিটে কোনো লোক নাই! একটু ভয়ও পেলাম মনে মনে। আরো ভালো করে তাকিয়ে রইলাম চালকের আসন বরাবর। গাড়িটি যখন আমাকে ক্রস করল তখন দেখলাম চালকের আসন থেকে দুই পাটি ঝকঝকে দাঁত আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসি দিয়ে হালকা হাতটা নেড়ে চলে গেল!

গত শনিবার দিনে-দুপুরে গাড়ি চালিয়ে স্যামস ক্লাবে যাচ্ছিলাম সপ্তাহের বাজার করতে। সিগন্যালে গাড়ি থামলে বাম পাশের বাসস্টপের কালো রঙের লোহার বেঞ্চে এক জোড়া খাকি প্যান্টের অদ্ভুতভাবে বসে থাকতে দেখলাম। এটা কীভাবে সম্ভব ভেবে আরো ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম প্যান্টের ভেতরের মানুষটা কালো রঙের হুডি পরে আয়েশ করে বেঞ্চে মাথা এমনভাবে হেলান দিয়ে বসে আছে যে—বেঞ্চ, হুডি, মুখ একাকার হয়ে গিয়ে প্যান্ট বাদে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। আচ্ছা, তোমরা জানো তোমাগো গায়ের রং অন্ধকারের মতো কালো; তাহলে অন্ধকার গায়ের রং নিয়ে অন্ধকার হওয়ার ঠিক আগে আগে তোমাদের অন্ধকার রঙের গাড়ি চালাতে কে বলেছে? আর দুনিয়ায় কি কালো বাদে অন্য কোনো রঙের হুডি নাই? তোমরা কি সাদা, লাল বা সবুজ রঙের হুডি পরে কালো বেঞ্চে বসতে পারো না?

আমি তখন বরিশাল মেডিক্যালের থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমাদের চাঁটগার বন্ধু সোলায়মানের বোনের বিয়ে খেতে বরিশাল থেকে রাতে লঞ্চে চাঁদপুর হয়ে ট্রেনে করে আমরা কয়েক বন্ধু চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। ঐটাই আমার জীবনের একমাত্র লঞ্চ ফলোড বাই ট্রেন জার্নি। চাঁদপুর থেকে ট্রেন ছেড়েছিল অনেক ভোররাতে। সকাল হওয়ার পরে ট্রেন যখন একেকটা স্টেশনে থামছিল, আর হকারদের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছিল। একটা আওয়াজ শুনছি অনেকটা এ রকম, ‘খেখ’... ‘খোখ’...। ‘খেখ’ আর ‘খোখ’। কিন্তু তারা যে কী জিনিস হকারি করছে বুঝতেছি না। আওয়াজটা চট্টগ্রামের যত কাছাকাছি যাচ্ছি তত বেশি শোনা যাচ্ছে। পরে এক বন্ধুকে জিগ্যেস করলে ও বলল, আরে বুঝলি না? ওরা ‘কেক’ আর ‘কোক’ বেচছে। আচ্ছা তোমরা জানো তোমাদের মুখে ‘কেক’ আর ‘কোক’টা ঠিকমতো আসে না। তাহলে তোমরা ‘পেপসি’ আর ‘বিস্কুট’ বা অন্য কিছু বেচতে পারো না? ‘কেক’ আর ‘কোক’ই কেন বেচতে হবে?

এক জাপানিজ ডাক্তার ইজিপ্টে দুই বছর কাজ করে এসে একদিন আমার সঙ্গে গল্প করছিলেন। তিনি বললেন, তুমি কি জানো ওখানে পপুলার ড্রিংকস কোনটা? আমি বললাম, কোনটা? উনি বললেন, ‘বেবসি’। আমি যখন ‘বেবসি’ জিনিসটা বুঝতে না পেরে মাথা চুলকাচ্ছিলাম, উনি তখন হেসে দিয়ে কষ্ট করে বললেন, ‘পেপসি’। আমি তখন হাহা করে হেসে দিলাম। আসলেই তো, ওরা তো ‘প’ উচ্চারণ করতে পারে না। এখানেও আমার প্রশ্ন, তোমরা জানো তোমরা ‘পেপসি’ বলতে পারো না। তাইলে তোমাদের ‘পেপসি’ খাইতে কইছে কে? তোমরা ‘কোকাকোলা’ খাও। নইলে ‘ফানটা’ খাও। কষ্ট করে ‘পেপসি’ খেতে কে কয়?

ডিসক্লেইমার :এ জগতের মধ্যে নির্মল হাস্যরসের ফল্গুধারা রয়েছে, এমনকি নিজেকে ব্যঙ্গ করার মধ্যেও। সুতরাং স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি কায়মনে কোনোভাবেই রেসিস্ট নই। এর সঙ্গে বলতে চাই, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’।

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিত্সক