মানুষ ত্রিনয়নের অধিকারী। দুটি নয়ন থাকে অক্ষিকোটরে, আর তৃতীয় নয়নটি থাকে অন্তরে লুক্কায়িত। অক্ষিকোটরের নয়ন দুটি কোনো বস্তুতে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর সাহায্যে অবাস্তব প্রতিবিম্ব গঠন করে, এবং তাকে দর্শনযোগ্য করে তোলে। আর লুক্কায়িত নয়নটি সে বস্তুর রূপ-রস-গন্ধকে ধারণ করে থাকে। মূলত এই নয়নটি জাগতিক উপলব্ধিকে দৃশ্যমান করে। এই উপলব্ধি নিজেকে নতুন করে চেনায়; নতুন ভাবনার দানা বাঁধায়; সাধারণ থেকে অসাধারণের জন্ম দেয়। আর এই ত্রিনয়ন বা লুক্কায়িত নয়নকে বিকশিত করে বই। তাই বইপড়া প্রয়োজন।
প্রত্যেক মানুষের ভেতর অন্তর্নিহিত একটি শক্তি থাকে। এই শক্তি যেমন শুভ বোধের জাগরণ ঘটাতে পারে, তেমনি অশুভ বোধেরও সহায়ক। তাই এই শক্তির জাগরণ যেমন প্রয়োজন তেমনি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা জরুরি। এই জাগরণ ও নিয়ন্ত্রণ উভয়ই করে থাকে বই। বই প্রথমত মানুষের সুপ্ত শক্তিকে উন্মুক্ত করে; দ্বিতীয়ত এই শক্তিকে খাদমুক্ত করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বৃহত্ পরিসরে বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করে দেয়। এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে যদি একবার সম্পূর্ণভাবে জাগ্রত করা সম্ভবপর হয়, তবে সে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষে অসাধ্য বলে কিছু থাকে না। পৃথিবীর যত হানাহানি-মারামারি-রাহাজানি-বাড়াবাড়ি—এসবের-ই সমাধান আছে বইয়ের কাছে। পড়ুয়া মানুষের হূদয়ে বই যে বীজ তৈরি করে, তাতে জন্ম নেয় এক বিশেষ বৃক্ষ। এই বৃক্ষে ফল ধরে মানবতার, ন্যায়ের, সাম্যের, ঐক্যের, ভ্রাতৃত্বের। যে সমাজে, যে রাষ্ট্রে এই ফল ধরতে শুরু করে সেখানে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার স্থান পায় না। আঁধার কেটে যায়, আলো আসে।
চেতনার বিপ্লবে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ পৃথিবীতে বইয়ের বিকল্প কিছুই চিন্তা করতে পারেন না। সমাজ বদলাতে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই মানুষের জীবনসঙ্গী। বই অবসরের প্রিয় বন্ধু। বই পাঠ মানুষকে সত্য পথে চলতে, মানবতার কল্যাণে অনুপ্রাণিত করে। বই সুখের সময় মানুষের পাশে থাকে। দুঃখের সময় মনোবল বাড়াতে সাহায্য করে। যে লোকটি বইকে নিত্যদিনের সঙ্গী বানিয়েছেন, তিনি সমাজের অন্য ১০ জন মানুষের চেয়ে ভিন্ন। তার মন-মনন আলাদা। চিন্তাচেতনা ভিন্ন। সহিষ্ণুতা আর বিশ্বাসের ধরনটাও আলাদা। ইচ্ছা করলেই বিবেক বিক্রি করে তিনি নষ্ট পথে ধাবিত হতে পারেন না। এক কথায় যিনি জ্ঞানী, তিনি কখনই সমাজ বিপর্যয়ের কাজে অংশ নিতে পারেন না। একজন পাঠকমাত্রই জ্ঞানের সাধক। আদিকাল থেকে তাই বইয়ের প্রতি এত কদর, এত ভালোবাসা।
এক সময় লাইব্রেরিগুলোতে পাঠকের উপচেপড়া ভিড় লেগে থাকত। যদিও এখন অধিকাংশ লাইব্রেরি পাঠকশূন্য। প্রযুক্তির কারণে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মোহ আর অনলাইনে পাঠ্যসামগ্রীর প্রাচুর্যে পাঠক এখন কিছুটা বইবিমুখ; কিন্তু পাঠক হ্রাসের ভিন্ন কারণও রয়েছে। আর্থিক দৈন্য, মেধার যথার্থই মূল্যায়ন না করা, জ্ঞানী-গুণীর প্রতি শ্রদ্ধা না করা। কিছু মানুষের বদ্ধমূল ধারণা এই সমাজব্যবস্থায় বই পড়ে কী হবে? অধিকাংশই জ্ঞানার্জনের চেয়ে অর্থ রোজগারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই বইপড়া থেকে অনেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। তাদের ধারণা বই পড়ে কী হবে? পৃথিবী তো টাকার গোলাম। টাকার কাছে হেরে যাচ্ছে মেধা-মনন আর সততা। টাকা হলে এই যুগে হাতের কাছে সব মেলে, এই ধারণাতেই জগত্ বহমান। তবে মনে রাখতে হবে, বইবিমুখ জাতি কখনো জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি সাধন করতে পারে না। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া একটি সমাজ স্থায়ী হতে পারে না। বই না পড়লে একটি দেশে জ্ঞানী-গুণীর সমাবেশ ঘটে না। আর দেশে গুণী না থাকলে দেশও সঠিক পথে চলতে পারে না। এই সমাজ-সামাজিকতায় যে সহিংসতা, যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তা নিবারণে প্রয়োজন আমাদের তৃতীয় নয়নের জাগরণ, অন্তরের শক্তির উন্মোচন। তাই বইপড়া ব্যতীত আমাদের মুক্তি নেই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
