নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তারদের ‘টেস্ট বাণিজ্যে’ অতিষ্ঠ রোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে শুধু কমিশনের লোভে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় সব টেস্ট করতে দিচ্ছেন অধিকাংশ ডাক্তার। তাদের ঠিক করে দেওয়া ডায়াগনস্টিক থেকে টেস্ট করানো না হলে সেসব রিপোর্ট দেখেন না তারা। এসব টেস্ট বাণিজ্যে মেতে থাকা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী লোকজন।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় নামকরা বিভিন্ন ক্লিনিকসহ শহরের আশেপাশে প্রায় অর্ধশত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা ভিজিটে রোগী দেখেন কয়েকশ ডাক্তার। এসব ডাক্তারের কাছে আগে থেকেই সিরিয়াল দিয়ে রাখতে হয়। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে এসব ডাক্তারের শরণাপন্ন হন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা। কিন্তু অসহায় এসব রোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে অধিকাংশ ডাক্তার প্রথমেই অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন টেস্ট করতে দেন এবং হাতে ধরিয়ে দেন নির্দিষ্ট একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজ। আর এতে করে চিকিত্সা সেবার নামে ডাক্তারদের টেস্ট বাণিজ্যের শিকার হতে হচ্ছে অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষকে। ‘যত টেস্ট তত টাকা’— এই কমিশন বাণিজ্যের মধ্য দিয়েই নারায়ণগঞ্জে চলছে একশ্রেণির ডাক্তারদের অর্থ উপার্জনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার পান শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন। একইভাবে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী ভর্তি, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রেসক্রাইব, অপারেশন নিশ্চিত করা, কেবিনে রোগী ধরে রাখা, এমনকি লাশ হিসেবে হস্তান্তর পর্যায়ের নানা ধাপেই কমিশন লেনদেন হয়।
সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নারায়ণগঞ্জে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ব্যবসার ছড়াছড়ি। সাইনবোর্ডসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠানে হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দিয়েই চলে রোগ নির্ণয়ের সব পরীক্ষা। তারা মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে অহরহ ঠকাচ্ছে নিরীহ মানুষকে। একই রোগ পরীক্ষায় একেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একেক রকম রিপোর্ট পাওয়ার অসংখ্য নজির রয়েছে। অভিযোগ তুলেও এসবের প্রতিকার মিলছে না। ডাক্তাররা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সরবরাহকৃত স্লিপে টিক মার্ক দিয়ে দেন কোন কোন টেস্ট করাতে হবে। রোগী নিজের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেই টেস্ট করালে ডাক্তার সে রিপোর্ট গ্রহণ করেন না। ডাক্তার তার নির্ধারিত সেন্টার থেকে আবার একই টেস্ট করিয়ে আনতে চাপ দেন। ওই সেন্টার তাকে কমিশন দেয়। কমিশন নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল চিকিত্সা মেলে। বেশি টাকা দিয়ে টেস্ট করিয়েও সঠিক রোগ নির্ণয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে অভিজাত হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারলেই শতকরা ৪০ ভাগ ‘ভর্তি ফি’ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের পকেটে যায়।
এ কমিশন বাণিজ্যের প্রভাবে চিকিত্সা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গরিব মানুষ চিকিত্সা নিতে গিয়ে আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অপারেশন, ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপি, অর্থোপেডিক রোগীদের ফিজিওথেরাপি, কিডনি রোগীদের ডায়ালিসিসের ক্ষেত্রেও আলাদা কমিশন নির্ধারণ করা আছে। এমনকি ওষুধ লেখার জন্য আগে থেকেই ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে কমিশনের নামে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা নেন অনেক চিকিত্সক।
এদিকে সরকারি সেবা রোগীদের জোটে না। সরকারি হাসপাতালের রোগ পরীক্ষার যন্ত্রগুলো হয় অকেজো, নয় তো মোড়ক থেকে খোলাই হয় না বছরের পর বছর। অনেক হাসপাতালে যন্ত্রগুলো চালানোর মতো দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। ফলে রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে ক্যান্সার নির্ণয় পর্যন্ত যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীরা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপরই নির্ভরশীল।
