ছেলেবেলায় সুনীলের ভ্রমণ সমগ্র ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ পড়তে পড়তেই রায়হানের মাঝে তৈরি হয় ভ্রমণের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। বরিশালের প্রত্যন্ত এক গ্রামে বড় হয়ে ওঠা তার। নদী, গাছপালা আর অবারিত সবুজের মাঝে খুঁজে পান জীবনের প্রকৃত স্বাদ। বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি আর খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা আকৃষ্ট করে তাকে। আর সেই আগ্রহের জায়গা থেকেই রায়হানের ভ্রমণ শুরু।
রায়হান পড়াশোনা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই ২০১৮ সালের শুরুর দিকে রায়হান তার বাংলাদেশ ভ্রমণের মিশন শুরু করেন। নাম দেন ‘মিশন ট্যুর দ্য বাংলাদেশ’।
অনেকটা লম্বা সময় নিয়ে তিনি দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ঘুরেছেন তিনি মাত্র একান্ন হাজার টাকায়। প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকলে অনেক কম খরচেও ঘুরে বেড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন রায়হান। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে তিনি মিশেছেন নানা সংস্কৃতি, ভাষা আর মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে। জীবনযাত্রার এই বৈচিত্র্য অনেক বেশি উপভোগ করেন তিনি।
দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রায়হান বলেন, ‘ভ্রমণ মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, বিশ্বকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়, আরও বিনয়ী হতে শেখায়। আমি যত বেশি ঘুরে বেড়াই, আমার নিজেকে তত বেশি ক্ষুদ্র মনে হয়। ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণ আমাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে।’
৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষে দেশের সর্বোচ্চ ১০ পর্বতশৃঙ্গ জয় করার সংকল্প করেন রায়হান। ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি শুরু করেন তার এই অভিযান। দীর্ঘ পরিকল্পনা শেষে প্রথম দফায় দুমলং, মাইথাই জামা হাফং পর্বতশৃঙ্গ দিয়ে তিনি তার যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফায় বাকি পর্বতশৃঙ্গগুলোতে আরোহণ করেন। সর্বশেষ কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ ১০টি পর্বতশৃঙ্গ জয় করেন। তার এই পুরো অভিযানটি ছিল অনেক বেশি অনিশ্চয়তার। পাহাড়ি এলাকায় নানা রকমের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয় তার।
এছাড়াও ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর ধর্ষণবিরোধী পদযাত্রা করেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো ৩ জন শিক্ষার্থীসহ তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার হাইকিং করেন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়াও গত বছর সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদে জামালপুরের লাউচাপড়া থেকে সিলেটের তামাবিল পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন রায়হান। স্বপ্নবাজ এই তরুণ বলেন, ‘সব সময়ই একজন পরিব্রাজকের স্বপ্ন থাকে ভ্রমণের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়া এবং জীবনকে আরো কাছ থেকে দেখতে শেখা।’
রায়হান এখন স্বপ্ন দেখছেন আরও বড় কিছু করার। দেশের গন্ডি পেরিয়ে তিনি তার পদচিহ্ন রাখতে চান পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। জয় করতে চান পৃথিবীর সর্বোচ্চ ৭টি পর্বতশৃঙ্গ। আগামীতে এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। পর্বতারোহণের ওপর আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণ শুরু করার কথা জানান তিনি।
রায়হান বলেন, ‘আমি একদিন এভারেস্ট জয় করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি মানুষের স্বপ্ন সব সময় বড় হতে হয়। কেননা যার স্বপ্ন যত বড়, তার বেঁচে থাকাটাও তত বিশাল।’
