ম্যাচের কাঠিতে ভিন্ন দৃশ্যকর্ম

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ২০:৪০

দৈনন্দিন প্রয়োজনে আমরা বিভিন্ন দ্রব্যাদি ব্যবহার করি। ব্যবহার শেষে তা ফেলনা হিসাবে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। কেমন হয় যদি এই ফেলনা কোনো  বস্তু দিয়েই তৈরি হয় হূদয়স্পর্শী কোনো দৃশ্যকর্ম, নিশ্চয় চমত্কার। এমনটিই করছেন রাজধানীর সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহম্মেদ। বাদ দেওয়া কিছু কাগজ, নষ্ট কর্কের টুকরা, কালি শেষ হওয়া বলপেন আর কয়েক গুচ্ছ ম্যাচের কাঠি দিয়ে তিনি তৈরি করেন অনন্যসব দৃশ্যপট। এসব কেবল মনোমুগ্ধকরই নয়; বরং প্রত্যেকটি দৃশ্যে লুকিয়ে থাকে বিশেষ একটি গল্প। যে গল্পে সুনিপুণভাবে ফুটে উঠে আমাদের বৈচিত্র্যময় জীবনের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার কথা। কখনো ইঙ্গিত আসে আমাদের সীমাবদ্ধতার, কখনো-বা দেখা মেলে সামাজিক কিছু দুর্গতি-সুগতি, সঙ্গতি-অসঙ্গতির।    

ফয়সালের এমন ব্যতিক্রমী শিল্পের ভাবনা প্রথমে মাথায় আসে ২০১৭ সালে। একদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়ে আলোকসজ্জিত মোমবাতির কিছু কারুকার্য। তখন ফয়সাল ভাবতে থাকেন— যদি মোমবাতির বদলে আমাদের ব্যবহার্য অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো ব্যবহার করে প্রাত্যহিক জীবনকে তুলে ধরতে পারি তাহলে কেমন হয়। এই ভাবনা থেকে ম্যাচের কাঠির সঙ্গে  কিছু ফেলনা বস্তু ব্যবহার করে প্রথম তৈরি করেন একটি দৃশ্যকর্ম। নাম দেন ‘ভেদাভেদ’। যেখানে দেখা যায় একজন মা তার শিশুকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন;  পাশে সমবয়সী আরেকটি শিশু হাতুড়ি পিটিয়ে ইট ভাঙার কাজ করছে। এই দৃশ্যকর্মটি ফয়সাল পরিবারের লোকজন ও শিক্ষকদের দেখালে তারা আনন্দিত হন এবং তাকে এমন শিল্পকর্ম তৈরি অব্যাহত রাখার জন্য পরামর্শ দেন। এরপর থেকে এমন বস্তু দিয়ে একে-একে শতাধিক দৃশ্যপট তৈরি করেন ফয়সাল। আর প্রতিটি দৃশ্যেই রয়েছে ভিন্ন গল্প; ভিন্ন স্বাদ ও ভিন্ন আবেদন।   

দৈনিক ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ফয়সাল বলেন, ‘শিল্প যেমন শিল্পীর ভেতরকার পরিচয় দেয়, তেমনি শিল্পীর একটি বিশেষ দায়বদ্ধতা থাকে সংশ্লিষ্ট সমাজকে উপস্থাপন করার। আমি আমার আশেপাশের পরিবেশ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার পাশাপাশি চারপাশে কী ঘটছে তা সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করি এবং তা নিজের মধ্যে গেঁথে নিই। এরপর সেগুলোকেই ম্যাচ-কাঠির ছোঁয়া দিয়ে শিল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি’।

ফয়সাল মাঝে মধ্যে নিজের ফেসবুক একাউন্টে এসব দৃশ্যপটের ছবি শেয়ার দিয়ে থাকেন। ক্যাপশনে লিখে দেন দৃশ্যের নেপথ্যে থাকা গল্প। অনেকে তা দেখে অভিভূত হয়ে জানতে চান তৈরির ক্রিয়া কৌশল। ফয়সাল তখন ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহীদের শিখিয়ে দেন। 

ফয়সালের জন্ম চাঁদপুর জেলার হাজিগঞ্জ উপজেলায়। শৈশব কেটেছে সেখানেই। হাজিগঞ্জ আল-কাউসার স্কুল থেকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন কুমিল্লা পলিটেকনিক কলেজে। বর্তমানে সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার ফাঁকে সময় পেলেই তিনি বসে যান এই দৃশ্যকর্ম তৈরির কাজে। এগুলো তৈরি করতে বেশ সময়ের প্রয়োজন হয়। কোনো কোনোটি শেষ করতে এক থেকে দুই সপ্তাহও লেগে যায় বলে জানান ফয়সাল। সুযোগ হলে তিনি এই শিল্পকে পেশা হিসাবে নিতে চান।