নি উমার্কেটের এক নম্বর গেটে মামুনকে দেখে চমকে উঠল সুলতানা। মাথা ভর্তি চুল, মুখে দাড়ি আর মোটা ফ্রেমের চশমাপরা মামুনকে চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি। ভিড় এড়িয়ে দ্রুত কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ মামুন? মামুন অপলক তাকিয়ে রইল। বৈশাখী বিকেলের রোদ সুলতানার মুখে পড়ছে। ব্যাগ হাতে মামুন কাঁপছে। সুলতানা মামুনের হাত ধরে ফাস্টফুডের দোকানের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দিল। ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছিয়ে দিল। ফাস্টফুডের দোকান কর্মচারী এসে জিজ্ঞেস করল, আন্টি আপনাদের কী দিব?
সুলতানা বলল, দু গ্লাস বেলের শরবত আর এক বোতল পানি দাও।
মামুনের দিকে তাকিয়ে সুলতানা বলল, তুমি এতটা রোগা হলে কী করে? কতদিন পর দেখা হলো?
বেলের শরবতটুকু শেষ করে মামুন বলল, চুয়াল্লিশ বছর পর। বিয়ের আগের দিন আমাকে বুঝিয়েশুনিয়ে চোখের পানি ফেলে বিদায় নিয়েছিলে।
সুলতানা বলল, এতোকাল কোথায় কাটালে?
মামুন বলল, কুড়িগ্রাম পিটিআই থেকে বছর সাতেক আগে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে অবসর গ্রহণ করলাম। বছরখানেক ধরে বড় ছেলের বাসায় থাকি। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নিউমার্কেট বন্ধ না থাকলে প্রায় প্রতিদিনই যেখান থেকে তুমি আমাকে বিদায় দিয়েছিলে সেখানেই ঘণ্টাখানেক কাটাই। গত এক বছরে কি একবারও নিউমার্কেট আসোনি?
আমি অনেককাল আমেরিকা ছিলাম। মাস তিনেক আগে ফিরেছি। আব্বার ধানমন্ডির বাড়িটা ডেভেলপারকে দেওয়া হয়েছিল। আমি দুটো ফ্ল্যাট পেয়েছি। একটাতে আমি একাই থাকি।
তারপর কথার ঝড় উঠল। দুজনেই ফিরে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলে আসা দিনগুলোতে। নিউমার্কেটের এক নম্বর গেট হয়ে উঠল নিত্য আড্ডার স্থান। প্রবীণ নরনারীর এই জোড়াকে অনেকেই ঈর্ষা করতে লাগল।
মাত্র এক মাসের মধ্যেই করোনার খবর হয়ে গেল। অবশেষে লকডাউনের ঘোষণা। মামুন-সুলতানার ঘরবন্দি জীবন শুরু হলো।
সুলতানা পাশের ফ্ল্যাটটি ননদের মেয়েকে কিছু কম ভাড়ায় দিয়েছেন। স্থায়ী গৃহকর্মী ছেলের অসুখের সংবাদে বাড়ি চলে গেছে। খণ্ডকালীন গৃহকর্মীকে ফ্ল্যাট মালিক সমিতি বাসায় ঢুকতে দিচ্ছে না। একদিন সকাল থেকে সুলতানার হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা, জ্বর শুরু হলো। করোনা আতঙ্কে আত্মীয়স্বজনকে কাছে পাওয়া গেল না। বিকেলে মামুনকে ফোনে অসুস্থতার সংবাদ জানাল।
সুলতানার শত বাধা উপেক্ষা করে মামুন বাসায় এসে হাজির। গরম পানি, লেবুর শরবত, চা, ফলমূল খেতে দিল। মামুন ছেলের ফোন পেয়ে জানিয়ে দিল, বন্ধু অসুস্থ তাই আজ বাসায় ফিরবে না।
চারদিন পর সুলতানা সুস্থ হয়ে উঠল। এবার মামুন অসুস্থ হয়ে পড়ল। কোভিড-১৯ পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হলো।
সুলতানার মেয়ে আমেরিকা থেকে ফোনে জানতে চাইল, তুমি কেন দিনের পর দিন মামুন সাহেবকে বাসায় রেখেছ? তোমার কি কোনো লাজ-লজ্জা নেই? আত্মীয়স্বজন ছিছি করছে। একদিন তুমি ভালোবাসার জন্য সাহসী হতে পারোনি। আজ বুড়ো বয়সে মানুষ হাসানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছ! তোমার কি একটুও বুক কাঁপল না?
মামুন ফোন পেল বিসিএস ক্যাডার মেয়ের, আব্বু তুমি এটা কী করলে? তিরিশ বছর আগে আম্মু মারা যাবার পর সবাই যখন তোমাকে বিয়ে করতে বলেছিল তখন তুমি বিয়ে করোনি। আমাদের বুকে আগলে রেখে মানুষ করেছ। আজ তোমার ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। তোমার নাতনি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আমাদের কথা একটুও ভাবলে না!
অনেক বাজার নিয়ে কেয়ারটেকার আর দারোয়ান হাজির সুলতানার দরজায়। তাদের দেখে সুলতানা বলল, আমরা দুজন স্বেচ্ছায় সুস্থ মস্তিষ্কে বিয়ে করেছি। তোমরা দুজন সাক্ষী থাকলে। ধরো, খেজুর নিয়ে যাও।
রাতে সুলতানার মেয়ে আমেরিকা থেকে ফোনে বলল, কেয়ারটেকার জানাল, তুমি বিয়ে করেছ!
সুলতানা বলল, হ্যাঁ। পাঁচ হাজার টাকা দেনমোহরে দারোয়ান-কেয়ারটেকারকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছি।
মেয়ে চিত্কার করে বলল, তুমি এত সস্তা!
সুলতানা শান্ত কণ্ঠে জানাল, দেনমোহর বেশি হলে অনেক লোকের সমাগম আর দামি খাবার হলে তবেই বিয়ে দামি হবে?
