ইসলাম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২১, ২১:২৮

ইসলাম শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির ধর্ম। সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা ও সহমর্মিতা এর পরম বৈশিষ্ট্য। এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। ‘আল্লাহ এক’ ইসলামের এই মতবাদই ইসলামকে সহিষ্ণু করেছে। মুসলমানরা এ কথা বিশ্বাস করে যে, মানুষ অসম্পূর্ণতা নিয়ে জগতে এসেছে। যারা দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করে তারা বিপথগামী ঠিক; তবু সেই এক খোদারই সৃষ্টি। তাই তারাও মুসলমানদের ভ্রাতৃস্থানীয়। তাদেরকে সত্পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব মুসলমানদের। কিন্তু যতদিন তারা স্বেচ্ছায় মুক্তির পথ বেছে না নিবে ততদিন সহজভাবেই তাদেরকে তাদের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আল-কোরআনে সে নির্দেশই এসেছে। সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেন, ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।’ ইসলামের এই শাশ্বত বাণীতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিবেকের স্বাধীনতা এবং উপাসনার স্বাধীনতা সংরক্ষিত রয়েছে।

ইসলামের নবি মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তিনি কেবল মুসলমানদের স্বার্থ বিবেচনা করতেন না, অমুসলিমদের অধিকারের প্রতিও খেয়াল রাখতেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মপালন ও বসবাসের ক্ষেত্রে তিনি যে নিরাপত্তা দিয়েছেন, অন্য কেউ তা আজ পর্যন্ত দিতে পারেননি। নবি করিম (সা.)-এর সময়ে প্রায় সমগ্র আরব উপদ্বীপ ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে চলে এসেছিল। অমুসলিম প্রজাদের সঙ্গে তার সর্বপ্রথম মিত্রতামূলক চুক্তি সম্পাদিত হয় নাজরানের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে। খ্রিষ্টানদের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রেখে নবিজি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তির বর্ণনায় স্পষ্ট লেখা রয়েছে—‘নাজরান ও তার আশপাশের অধিবাসীদের জীবন, তাদের ধর্ম, তাদের ভূমি, তাদের সম্পদ, তাদের উপস্থিত-অনুপস্থিত লোকজন, তাদের দূতবৃন্দ, তাদের উপাস্য প্রতিমাসমূহ আল্লাহর নিরাপত্তা এবং তার রসুলের হেফাজতে থাকবে। তাদের বর্তমান অবস্থার কোনো পরিবর্তন সাধন করা হবে না। তাদের কোনো অধিকারেও হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাদের মূর্তিসমূহ ধ্বংস করা হবে না। তাদের কোনো ধর্মগুরুকে ও সন্ন্যাসীকে তার সাধনা থেকে এবং গির্জার কোনো পরিচালককে তার পদ থেকে অপসারণ করা হবে না। যা কিছু তাদের দখলে রয়েছে, তা সেভাবেই থাকবে। তাদের জাহেলিয়াত যুগের কোনো অপরাধ বা খুনের বদলা নেওয়া হবে না। তাদেরকে কোনো সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে না। ইসলামি ফৌজ তাদের জনপদকে পদদলিত করবে না। তাদের কেউ নিজের কোনো অধিকার দাবি করলে তার সঙ্গে সুবিচার করা হবে। তাদেরকে অত্যাচার করার সুযোগ দেওয়া হবে না এবং তাদের ওপর কোনো অত্যাচার করা হবে না। যে ব্যক্তি তাদের থেকে সুদ গ্রহণ করবে, সে আমার জিম্মা থেকে মুক্ত। চুক্তিপত্রে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে সর্বদা আল্ল­াহ্র নিরাপত্তা ও মুহম্মদ (সা.)-এর জিম্মাদারি বহাল থাকবে—যতদিন না এই ব্যাপারে আল্ল­াহ্র পক্ষ থেকে অন্য কোনো নির্দেশ আসে। তারা যতদিন মুসলমানদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকবে, তাদের সঙ্গে চুক্তির যেসব ধারা সংযুক্ত হয়েছে, তা পালন করা হবে।’

নবিজির এই চুক্তি বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হলো যে, ইসলাম বিধর্মীদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করবে না এবং তাদের অধিকার খর্ব করবে না। নবিজির পর খোলাফায়ে রাশেদিন এ নীতি পুরোপুরি মেনে চলেছে। জেরুজালেম শহর হজরত উমর (রা.)-এর হস্তগত হওয়ার পর সেখানকার গির্জায় তিনি নামাজ পড়েননি এই আশঙ্কায় যে, ভবিষ্যতে কেউ এসে তার নামাজের বরাত দিয়ে এটিকে মসজিদ বানিয়ে ফেলতে পারে।

ইসলাম সব দিক দিয়ে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। তাদের প্রাণকে মুসলমানদের প্রাণের সমান সম্মান দিয়েছে। ইমাম বায়হাকি বলেন, ‘নবি করিম (সা.)-এর সময় একজন মুসলমান জনৈক আহলে কিতাবিকে হত্যা করেছিল। নবিজির নিকট মুকাদ্দমা পেশ করা হলে, তিনি বললেন, আমার ওপর জিম্মির অঙ্গীকার পালন করার অধিক জিম্মদারি এসেছে। এই বলে তিনি ওই মুসলিমের প্রাণদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন। (বায়হাকি ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০)। খোলাফায়ে রাশেদিনের মধ্যে হজরত আলি (রা.) ছিলেন ইসলামি আইনের সর্বোচ্চ জ্ঞানী ও নির্ভুল ফায়সালাকারী। তিনি সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে খুব সচেতন ছিলেন। একবার তার কাছে এক জিম্মির মুকদ্দমা পেশ করা হয়। হত্যাকারী ছিল একজন মুসলিম। সাক্ষ্য প্রমাণে তার অপরাধ প্রমাণিত হলে তিনি হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। রায়ের পর নিহতের ভাই এসে বলল, ‘হে আমিরুল মু’মিনীন! আমি হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছি। হজরত আলি (রা.) বললেন, মনে হচ্ছে, লোকেরা তোমাকে ভীতি প্রদর্শন করেছে। ঐ ব্যক্তি বলল, না, এমন কিছু ঘটেনি। তবে ভাই যেহেতু আর ফিরে পাব না! তা-ই ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে তারা আমাকে রাজি করে নিয়েছে। এরপর হজরত আলি (রা.) বললেন, ‘তুমি জানো আর তোমার কর্ম জানে। তবে মনে রেখো, ঐ জিম্মির দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তাবে। তার রক্ত আমাদের রক্তের সমান এবং তার রক্তপণ আমাদের রক্তপণের সমান। সংখ্যালঘুদের জীবনের নিরাপত্তার মতো তাদের ধনসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রেও ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। তাদের সম্পদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ ইসলাম সমর্থন করে না। হজরত উমর (রা.) সর্বদা প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও সামরিক আমলাদের এ বিষয়ে নির্দেশ দিতেন। একবার এক ব্যক্তি টাইগ্রিস নদীর তীরে ঘোড়া লালন-পালনের জন্য উমর (রা.)-এর কাছে একখণ্ড জমি চাইল। তিনি বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরিকে লিখে পাঠালেন, ‘যদি ঐ জমি জিম্মিদের সম্পত্তি না হয়ে থাকে এবং সেখান দিয়ে কূপের পানি যাতায়াত না করে, তাহলে ঐ জমি প্রার্থীকে দিয়ে দেওয়া হোক।’ (ফতহুল বুলদান)। এভাবে আমরা সংখ্যালঘু অমুসলিমদের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখার ও তাদের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।

lলেখক :এমফিল গবেষক, খতিব, মনিপুর বাইতুল আশরাফ (মাইকওয়ালা) জামে মসজিদ, মিরপুর, ঢাকা