সম্প্রতি দেশের ছয়টি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী ও রংপুরে সংঘটিত এসব হামলার ঘটনার তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশপ্রাপ্তির দুই মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার দ্বৈত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেয়। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে হামলার ঘটনায় যেসব ফৌজদারি মামলা হয়েছে সেগুলোর তদন্তে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাসগৃহ, জীবন ও সম্পত্তির ওপর হামলা ঠেকাতে সরকারের স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত। একইসঙ্গে তাদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া গত ১৩ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজার মণ্ডপ, মন্দির, বসতি, জীবন ও সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, ধর্ম সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি (আইসিটি বিভাগ) সচিব, নারী ও শিশু বিষয়ক সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, কুমিল্লা, চাদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও রংপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ২১ বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের কয়েকটি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, বাসস্থান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট অনুপ কুমার সাহা ও মিন্টু চন্দ্র দাশ। ঐ রিটের শুনানিতে রিটকারী পক্ষের কৌসুলি ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব ছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু সেই নিরাপত্তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতাও এক ধরনের অপরাধ। অতএব এসব ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঘটনার কথা শুনছি। কিন্তু কীভাবে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব, সেটা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, রিট আবেদনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও স্থানীয় প্রশাসনকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র ও সরকার বসে নেই। কুমিল্লা, রংপুরে অনেক দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, বাসস্থান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ নিয়েছে। একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিটকারী আইনজীবীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে আদালত বলেন, এ অবস্থায় আমরা কি রাষ্ট্রকে দায়ী করতে পারি? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সরকার তো নিশ্চুপ হয়ে বসে নাই। যেখানে হামলার ঘটনা ঘটেছে সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পাশাপাশি রুল জারি করেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
