l শাহিনুর আলম কলি
আজকাল বেশিরভাগ পরিবারই একদম ক্ষুদ্র। যৌথ প্রথা ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিয়েছে অনেক আগেই। স্বামী-স্ত্রী আর দুটি সন্তান—বর্তমান যুগে এটাই বেশিরভাগ পরিবারের মূলনীতি। অনেকে তো দুটি নয়, বরং একটি সন্তানেই খুশি। শিশুদের ক্রমাগত মনোযোগ প্রয়োজন, বিশ্বয়ানের এই যুগে শিশুকে প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রদান করা বাবা-মা’র জন্যও কঠিন। তাই দ্বিতীয় সন্তান গ্রহণের বিষয়ে তারা ভীত। আধুনিক যুগের কমার্শিয়াল জীবন যাপনে একটি সন্তান নিলে হয়তো মা-বাবার অনেক সুবিধা হয়। পিতা-মাতার অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র সন্তানকে দেখাশোনা করা সহজ হয়। তারা সন্তানকে বড় করার জন্য তার প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে পারে। বাবা-মায়ের মনোযোগ, অর্থনৈতিক অবস্থা, পারিবারিক সহায়তা সামাজিকীকরণে ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন এবং সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে; একইসঙ্গে তারা এই শিক্ষায় তাদের সমস্ত সময় এবং শক্তি উত্সর্গ করতে পারে। সবরকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মানুষ করার জন্য আজকাল অনেক মা-বাবাই একটি মাত্র সন্তান চাইছেন। আবার তাদের মনে কিছুটা শঙ্কাও থেকে যাচ্ছে—একমাত্র সন্তান মানেই বুঝি একরোখা, জেদি আর বদমেজাজি।
অনেকেই বলেন, একাধিক সন্তান না থাকলে সে একাকী হয়ে পড়ে। আর এতে ভাই-বোনের অভাবে সে নানা সামাজিক বিষয় শিখতে পারে না। তাই একমাত্র সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করাটাই জীবনের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আজকাল সন্তানেরা একটু বেশি স্বাধীনতা চায় এবং তারা যেন একটু বেশিই সংবেদনশীল। তাই খুব সহজেই ঘটে যায় নানা বিপত্তি। সন্তানকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বাবা-মা’র জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় এখানে কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলো—
সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিন
যদি বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী হয়ে থাকেন তাহলে সন্তানকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও সন্তানের জন্য বুদ্ধি করে সময় বের করে নিতে হবে। একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র হচ্ছে তার পরিবার। পরিপূর্ণ শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, আচরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে পারিবারিক মূল্যবোধ। তাই সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া জরুরি। ছোটবেলার এই শিক্ষাই তাকে পরবর্তী জীবনের সঠিক জ্ঞান ও সুপথে পরিচালিত করবে। আর এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই সপ্তাহের ছুটির দিনটি তার জন্য বরাদ্দ রাখুন। ছোটাছুটি, বেড়ানো, বাইরে খাবার খাওয়াসহ সেই দিনটি যেন শুধুই তার হয়। স্কুলে হোমওয়ার্ক করতে তাকে সাহায্য করুন। যেহেতু তার আর কোনো ভাই বা বোন নেই, তাই তাকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন। তার যেকোনো ভালো কাজে উত্সাহ দিন। বুঝতে দিন, তার সাফল্যে আপনারা অনেক খুশি। মাঝে মাঝে নিজের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাকে পাশে রাখুন, যেন সে আপনার জীবনে নিজের গুরুত্বটা অনুভব করে। তার সঙ্গে প্রাণ খুলে হাসুন এবং কথা বলুন। মনে রাখবেন, আপনার অজান্তে শিশুটি হয়ত আপনাকেই অনুসরণ করছে। তাই আপনার সুন্দর আচরণই শিশুর ভবিষ্যতের ভিত্তি। মনে রাখবেন, বাবা-মা তাদের সন্তানদের সময় দিতে পারে না বলেই সন্তান বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগে। বিশেষ করে মা-বাবার সময় ও অর্থের অভাববোধ থেকে তাদের মানসিকতায় ক্ষতিকর প্রভাব ঘটে। তথ্যপ্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি সন্তানকে আরেক ধাপ নষ্ট হওয়ার পথে ধাবিত করে। তাই সন্তানের হাতে নিত্য নতুন বই তুলে দিতে হবে। যা ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন
সন্তান যখন আপনার সঙ্গে কিছু শেয়ার করতে চাইবে, তখন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনুন। তার যেহেতু কোনো ভাইবোন নেই, তাই সব কথা সে আপনাদের কাছেই বলতে চাইবে। তাছাড়া সন্তান তাদের যেকোনো সমস্যার কথা অনায়াসে বাবা-মাকে শেয়ার করবে—এটাই স্বাভাবিক। সন্তানের সঙ্গে প্রত্যেক বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখাটা খুব প্রয়োজন। কারণ, যে পরিবারের সন্তান তাদের বাবা-মা’র সঙ্গে যত বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ, সেই পরিবারের সন্তান খুব কমই বিপথগামী হয়। আপনার অনেক কাজের ফাঁকেও তার কথাগুলো শোনার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় রাখবেন। তাহলে সে আর নিজেকে একা মনে করবে না।
সন্তানকে স্পেস দিন
সন্তানের ওপর সবসময় নজরদারি করবেন না। ওকে কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটাতে দিন। ছোট হলেও তার নিজস্ব একটা জগত্ আছে। সেই জগতে তাকে নিজের মতো করে ভাবতে দিন। সবকিছুতে বাধা পেলে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে। তাকে সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
ঘর হোক সুখময়
সন্তানকে মাঝে মধ্যে ঘরের ছোটখাটো কিছু দায়িত্ব দিতে পারেন। এতে সে নিজেকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনে করবে এবং পরিবারের প্রতি তার আগ্রহ জন্মাবে। সেসব দায়িত্ব হতে পারে আপনাকে কোনো কাজে নিয়মিত সহায়তা করা অথবা গাছে পানি দেওয়া বা রুম গুছিয়ে রাখা; হতে পারে আপনাকে রান্নায় সাহায্য করা কিংবা দু-একটা গল্প পড়ে শোনানো। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই উত্সাহ দিন নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে। যদিও অনেকেই এটাকে পরাধীনতা মনে করে। তবে প্রকৃতঅর্থে, নিয়ম মেনে চলা মানে পরাধীনতা নয়। বরং শৃঙ্খলা হচ্ছে জীবনকে গুছিয়ে চলা। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান বাদ দিবেন না। মাঝে মধ্যে ফ্যামেলি গেট-টুগেদারের আয়োজন করতে পারেন। এতে করে আপনার সন্তান পরিবারের বড়দের সান্নিধ্যে আসবে এবং পরিবারের কম বয়সী সদস্যদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।
শখের কাজে উত্সাহ দিন
আপনার শিশু অতিরিক্ত লাজুক কিংবা অন্তর্মুখী হলে ছোটবেলা থেকে তার পছন্দের শখ বেছে নিতে সাহায্য করুন। যা ভালো লাগে তাই করতে দিন। তবে তাকে সেই কাজে অবশ্যই প্রথম হওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করবেন না। তার সৃজনশীল কোনো কাজের তুলনামূলক বিচার করবেন না। তার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলার জন্য সে যা পছন্দ করে বা তার আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে তাকে নতুন তথ্য জানার সুযোগ করে দিন। দেখবেন, পরবর্তী সময়ে নিজেই গুরুত্ব অনুযায়ী কাজগুলো করে নিতে পারবে।
আত্মরক্ষার কৌশল শেখান
আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার একমাত্র সন্তান যেন নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে সেজন্য তাকে আত্মরক্ষা করতে শেখান। সন্তান একটু বড় হলেই আপনার বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজন সবার সঙ্গে মেলামেশা করার সময় শারীরিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখতে শেখান। তাই জুডো, কারাতেসহ নানা রকমের শারীরিক কসরত্ শেখাতে পারেন। তাকে শক্তিশালী করুন মননে এবং শারীরিক শক্তিতে। কোনো বিপদে সে যেন সাহস না হারিয়ে প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে পারে। এককথায়, ভয়কে জয় করার শিক্ষা দিন।
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’— এই উক্তির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বলা যায়, পরিবারের একক কোনো সন্তান যেন তার বাবা-মার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে। সেইসঙ্গে ঝামেলামুক্ত জীবন যাপন করার মাধ্যমে ভালো থাকে। মনে রাখা চাই, সন্তানকে সবকিছু শেখানো যে বাবা-মা’রই দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন হতে হবে যথাযথ। তবেই সন্তান সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে।
