মুক্তির পয়গাম : দাওয়াত ও তাবলিগ

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৬

প্রতিটি বিষয়ে প্রতিটি মানুষের মতো ও পথের ভিন্নতা রয়েছে। তবে কিছু বিষয় এমনও রয়েছে যেখানে কারো মতের কোনো ভিন্নতা নেই। পৃথিবীর ধনী-গরীব, আমীর-ফকীর সবারই একটা চাওয়া, আর তা হলো— একটু সুখ। কিন্তু কোথায় এই সুখ? সবাই হন্যে হয়ে ছুটছে এই সুখ পাখিটার সন্ধানে। কিন্তু কোত্থাও দেখা মিলছে না তার। কারণ, মানুষ সুখ খোঁজে পার্থিব উন্নতির মাঝে, শান্তি খোঁজে জাগতিক ভোগ-বিলাসিতার মধ্যে। অথচ কাড়ি কাড়ি টাকা, আলীশান বাড়ি আর অঢেল প্রাচুর্যের মাঝে কোনো সুখ নেই, শান্তি নেই। কেননা এই সুবিশাল মহাবিশ্বের যিনি স্রষ্টা তিনিই তো জানেন কিসে বান্দার সুখ আসবে। জাগতিক ভোগ-বিলাসিতার মাঝে আল্লাহ প্রকৃত সুখ রাখেননি। সকল সুখ রেখেছেন তিনি তাঁর আনুগত্যের মাঝে। দুনিয়ার লোভ-লালসা বিসর্জন দিয়ে তাঁর পথে ফিরে আসার মধ্যেই তিনি রেখে দিয়েছেন মানবতার চিরন্তন শান্তি।

সুখ-শান্তি, কল্যাণ আর মুক্তির এই পয়গাম মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যই যুগে যুগে আল্লাহ তা’আলা লক্ষাধিক নবী-রাসূলকে এই জগতে প্রেরণ করেন। তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্যই ছিল মানুষকে শান্তি ও কল্যাণের পথের সন্ধান দেয়া, দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পয়গাম পৌঁছে দেয়া। কুরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে- ‘আর আমি প্রত্যেক জাতির মাঝেই একজন করে রাসূল পাঠিয়েছি এই বার্তা নিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিত্যাগত কর। (সূরা নাহল-৩৬)। সর্বশেষে এই দাওয়াত ও পয়গাম নিয়ে যিনি এই পৃথিবীতে আগমন করেছেন তিনি হলেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (স)। জগতে কিভাবে মানব জাতির সুখ ও শান্তি মিলবে সেই বার্তা তিনি পৌঁছে দিয়েছেন সমগ্র মানব জাতির কাছে। তাঁর এই শাশ্বত আহ্বান সম্পর্কে আল্লাহ তা’লা ঘোষণা করন- ‘হে রাসূল! আপনি বলুন, এটাই আমার পথ। বুঝে-শুনে এই পথেই আমি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি, এবং যারা আমাকে অনুসরণ করে তারাও।’ (সূরা ইউসূফ-১০৮)

আল্লাহ রাসূলের ইন্তেকালের পর এই পয়গাম মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, পথভ্রান্ত এই মানবতাকে সঠিক পথের দিশা দেয়া তাঁর অনুসারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই দায়িত্বের ব্যাপারে সূরা আল-ইমরানে আল্লাহ তা’লা বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি জাতি এমন থাকবে, যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে। এবং ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে।’ (আল ইমরান-১০৪)। রাসূলের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ এই গুরু দায়িত্বকে আঞ্জাম দেয়ার জন্য বিশ্বব্যপী কাজ করে যাচ্ছেন।

দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি: কুরআনে কারীমের সূরা বাকারায় এরশাদ হয়েছে- ‘হে আমাদের প্রভু! তাদের মাঝে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদেরকে আপনার কিতাবের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শুনাবেন, এবং আপনার কিতাবের জ্ঞান তাদেরকে শিক্ষা দিবেন, এবং শিক্ষা দিবেন হিকমত ও প্রজ্ঞা, এবং তাদের আত্মশুদ্ধি করবেন।’ (সূরা বাকারা-১২৯)। এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, রাসূলের মৌলিক দায়িত্ব ছিল চারটি- ১. মানুষকে কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা দেয়া। ২. কুরআনের তাফসীর, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শিক্ষা দেয়া। ৩. হিকমত তথা সুন্নাহর জ্ঞান শিক্ষা দেয়া। ৪. মানুষের আত্মশুদ্ধি করা। নবুওয়াতি জিন্দেগীর তেইশ বছরে রাসূল (স) মৌলিকভাবে এই চারটি দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূলের এই চারটি কাজ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বকেই বলা হয় ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’। রাসূলের পর মুসলিম উম্মাহ যুগে যুগে দাওয়াত ও তাবলিগের এই মহান কাজ করে আসছেন বিভিন্ন পন্থায়। মাদরাসা-মসজিদ, মারকায-খানকাহ, ওয়াজ-নসীহত, বই-পুস্তক প্রকাশ ইত্যাদির মাধ্যমে আজও এই দাওয়াতি মিশন চলছে। সুতরাং যারা মক্তবে ছোট ছোট শিশুকে কুরআন শেখাচ্ছেন তারা যেমন দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ আঞ্জাম দিচ্ছেন, তেমনি যারা মাদরাসা-মসজিদে মানুষের কাছে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান পৌঁছে দিচ্ছেন তারাও মূলত দাওয়াত ও তাবলিগের কাজই আঞ্জাম দিচ্ছেন। আবার যারা আত্মশুদ্ধির পদ্ধতি অনুসরণ করছেন কিংবা তিনদিন-চল্লিশ দিনের জন্য দ্বারে দ্বারে গিয়ে আল্লাহ ভোলা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকছেন তারাও মূলত রাসূলের এই দায়িত্বের তাবলিগই করছেন।

দায়ীর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী: যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবে, যারা রাসূলের শাশ্বত পয়গামকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিবে তাদের পথ ও পদ্ধতি ভিন্ন হলেও তাদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী অবশ্যই অভিন্ন হবে। আল্লাহর রাসূল (স) যে সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী নিয়ে মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন সেই বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী প্রত্যেক দাঈ’র মাঝে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে রাসূলের সবচেয়ে বড় যে বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা হলো- নম্রতা ও বিনয়। এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমে এরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই আপনি মানুষের প্রতি সদয় হয়েছেন। আর আপনি যদি রাগী মেজায এবং পাষাণ হূদয়ের অধিকারী হতেন তাহলে আপনার চারপাশের মানুষগুলো আপনার দিকে ছুটে আসত না।’ (সূরা আল ইমরান-১৫৯)। সাহাবায়ে কেরামের এই বিশাল জামাত রাসূলের চারপাশে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় একত্রিত হওয়ার মূল কারণ ছিল রাসূলের সদয় ও বিনম্র আচার-ব্যবহার। তাই একজন দায়ীর সবচেয়ে বড় গুণ হতে হবে- মানুষের সাথে নম্র ও কোমল আচরণ করা। ধৈর্য ও ছবর ছাড়া দাওয়াতের কাজ করা সম্ভব নয়। কথায় কথায় চটে গেলে, সামান্যতেই গরম হয়ে গেলে, গালিগালাজ করলে মানুষকে দাওয়াত দেয়া সম্ভব নয়। এজন্যই আল্লাহ তা’লা কুরআনে কারীমে এরশাদ করছেন- ‘হে রাসূল! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। আপনার ধৈর্য ধারণ একমাত্র আল্লাহ তা’লার জন্যই। এবং তাদের জন্য দুঃখবোধ করবেন না।’ (সূরা নাহল-১২৭)।

দায়ীর ভাষা ও বচন ভঙ্গি কেমন হবে এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’লা কুরআনে কারীমে এরশাদ করেন- ‘হে রাসূল! আপনি মানুষকে স্বীয় প্রভুর পথে আহ্বান করুন হিকমাত তথা প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে। আর লোকদের সাথে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পন্থায়।’ (সূরা নাহল- ১২৫)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. বলেন- এই আয়াতে আল্লাহ তা’লা মানুষকে দাওয়াত ও তাবলিগের তিনটি উপায় শিক্ষা দিয়েছেন- ১. হিকমাত তথা মযবুত দলিল-প্রমাণের আলোকে, প্রজ্ঞাজনোচিত ভঙ্গিতে অত্যন্ত পরিপক্ব ও অকাট্য বিষয়বস্তু পেশ করা, যা শুনে বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান লোকও আল্লাহর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ২. মাওয়ায়েযে হাসানাহ অর্থাত্ মনোজ্ঞ ও হূদয়গ্রাহী উপদেশ, যাতে আল্লাহ বিমুখ পাষাণ হূদয়ও বিগলিত হয় এবং একটি হতাশ ও ক্ষয়ে যাওয়া জাতি গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে। ৩. সর্বোত্তম পন্থায় তর্ক-বিতর্ক করা অর্থাত্ যারা হিকমাতপূর্ণ কথা গ্রহণ করে না এবং ওয়াজ-নসীহতেও কান দেয় না, বরং তর্কে লিপ্ত হতে চায় তাদের সাথে নিষ্ঠা এবং শিষ্টাচার বজায় রেখে উত্কৃষ্ট পন্থায় বিতর্ক করা। অহেতুক, বেদনাদায়ক ও শিষ্টাচার বর্জিত কথাবার্তা না বলা; যার দ্বারা সমস্যার কোনো সুরাহা তো হয়ই না; বরং শুধুমাত্র আলোচনা প্রলম্বিত হয়। (তাফসীরে উসমানী: ২/৬২৮-৬২৯)

বিশ্ব মুসলিমের এই গণ জমায়েতে মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের মাঝে রাসূলের সেই দাওয়াতী চেতনা জেগে উঠুক, ফিরে আসুক আমাদের সেই সোনালী দিন— এই কামনা করছি আল্লাহর কাছে।n