কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাবলিগ জামাতের ছয় মূলনীতি

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৮

আল্লাহর পথে আহ্বান করা মুসলমানদের একটি নববি দায়িত্ব। উপরন্তু এটি একটি ফরয কাজ। আল্লাহ তা’আলার সুস্পষ্ট নির্দেশ: ‘তোমার প্রভুর পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।’ [সূরা আন-নাহল: ১২৫] আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও একই নির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন: ‘আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও।’ [সাহীহ বুখারী] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন: প্রতিটি মুসলমানের   জন্যেই তাবলিগ তথা অপরের নিকট দীন পৌঁছানো ফরজ; কমপক্ষে একটি আয়াত অথবা একটি হাদিসের মাধ্যমে হলেও। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পক্ষ থেকে অর্পিত এই ফরজ কাজ পালনের জন্যে তাবলিগ জামাত সদা তত্পর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। দীনের পথে জীবন পরিচালনাকে সহজ ও ছকবদ্ধ করার প্রয়োজনকে সামনে রেখে এই জামাতের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ মুরুব্বিগণ ছয়টি ‘উসূল’ বা মূলনীতি ঠিক করেছেন, যেগুলোকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে একজন সাধারণ মুসলিম সহজেই ঈমান ও আমলের উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে নিজেকে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। এগুলো হচ্ছে: ঈমান, নামাজ, ইলম ও জিকির, একরামুল মুসলিমিন, এখলাস, দাওয়াত ও তাবলিগ।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই ছয়টি মূলনীতি যথাযথ ও প্রামাণ্য। মূলনীতিগুলোর প্রথমেই ঈমানের উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ইসলামি জিন্দেগির মূল প্রাণই হচ্ছে ঈমান তথা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও এর মৌখিক-ব্যবহারিক স্বীকৃতি প্রদান। সূরা আল-বাকারার ১৭৭নং আয়াতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এরপরেই নামাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ঈমান আনয়নের পর প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো নামাজ আদায় করা। তাছাড়া, কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয় নামাজের মাধ্যমেই। আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নামাজ ত্যাগ করাটাই ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য করে দেয়’ [সুনানে তিরমিযী] তৃতীয় মূলনীতির ব্যাপারেও কুরআন-হাদিসে উত্সাহ ও নির্দেশনা পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাহদের মধ্যে জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে’ [সূরা ফাতির: ২৮] তাবলিগ জামাত মানুষের মনে আল্লাহভীতি ও পরহেজগারিতা জাগিয়ে তুলতে চায়। তাই ইলম তথা জ্ঞানকে তাদের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। শুধু ইলম বা জ্ঞান অর্জন করলেই ব্যক্তি আল্লাহভীরু হন না, সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয় জিকির তথা আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত হওয়া। তাই জ্ঞানের পাশাপাশি জিকিরের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: ‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়’ [সূরা আর-রা’দ: ২৮]

আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দাহর হকের দিকেও খেয়াল রাখার জন্য ইসলাম গুরুত্ব দেয়। অপর মুসলমান ভাইকে সম্মান করা, তার ইজ্জত-আব্রুকে হেফাজত করা, হিংসা-বিদ্বেষ বা অন্যান্য শত্রুতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অসংখ্যবার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই’ [সূরা হুজুরাত: ১০] আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘যে বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’ [তাবারানী]

ব্যক্তির আমলকে পরিশুদ্ধ ও নিখাদ রাখার জন্য এখলাস তথা ‘নিষ্ঠা’র বিকল্প নেই। আর তাই উপর্যুক্ত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পেরিয়ে এসে পঞ্চম মূলনীতি হিসেবে এখলাস-কে ঠিক করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: ‘তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে’ [সূরা বাইয়িনাহ: ৫]

এই কর্মসূচি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালনের মাধ্যমে ব্যক্তি যখন নিজেকে গঠন করতে সমর্থ হবেন, তখন দাওয়াত ও তাবলিগের মহান মেহনত আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হবেন। ষষ্ঠ মূলনীতির মূলকথা এটাই। তাবলিগের নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তা’আলার দেওয়া। তিনি প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উদ্দেশ করে বলেছেন: ‘হে রসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে।’ [সূরা আল মায়েদা: ৬৭] এই আয়াতে ‘বাল্লিগ’ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তাঁর নবীকে দীন প্রচারের কথা বলেছেন, যে শব্দটি ‘তাবলিগ’ উত্সমূল থেকে নির্গত। এ কারণেই তাবলিগ তথা দীন প্রচারের মেহনতকে ‘নববি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।