বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ব ইজতেমা ২০১৯। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবারের ইজতেমার আয়োজন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এজন্য বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাদের প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানতে তাদের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা। সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছেন— পিনাকি দাসগুপ্ত, ফাইজুল ইসলাম ও মুজিবুর রহমান
সা ক্ষা ত্ কা রে র প্র শ্ন
১. নানা অনিশ্চয়তার পর অবশেষে এ বছর আজ শুক্রবার থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। বাংলাদেশে নিয়মিত এই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
২. এবারের বিশ্ব ইজতেমার সুষ্ঠু আয়োজনে আপনার বা আপনার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী?
৩. বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও বিশ্ব ইজতেমার মুসল্লিদের উদ্দেশে আপনি কি কিছু বলতে চান?
আ ক ম মোজাম্মেল হক
মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়
১. বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখি। এ আয়োজনটি মুসলিম বিশ্বের একটি মর্যাদাপূর্ণ বিষয় বলে মনে করি। প্রতি বছর ইজতেমায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এতে যোগদান করেন।
২. মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় এ সমাবেশটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমাদের সরকার সর্বতোভাবে সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। আর গাজীপুরবাসী হিসেবে এতে আমাদের অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা ছিল, আছে এবং থাকবে। গত ২২ বছর যাবত্ জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি নিবিড়ভাবে এ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছি। তবে এ বছর যাতে বিবদমান দুটি গ্রুপের মধ্যে কোনো সংঘাত না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সচেতন ও সতর্ক আছি। শান্তিপূর্ণভাবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা সম্পন্ন করার জন্য যত রকমের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। কোনো মহলই যাতে কোনো প্রকার অপতত্পরতা চালাতে না পারে আমরা সে ব্যাপারে সচেষ্ট আছি।
৩. ইসলাম শান্তির ধর্ম। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। অন্যান্য ধর্মের প্রতিও আমাদের সহমর্মিতা থাকা উচিত। তাই সর্বক্ষেত্রে সহনশীলতা ও ধৈর্য নিয়ে বিশ্ব ইজতেমার মতো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
আসাদুজ্জামান খান কামাল
মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
১. এ বছর সম্মিলিতভাবেই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভিরু। লাখো মুসল্লি বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করছেন। তারা দীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নামে ইজতেমায়। প্রতি বছর বাংলাদেশ বিশ্ব ইজতেমাটি আয়োজন করে। এ আয়োজন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।
২. প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। প্রতিবারই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইজতেমা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্যে ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকল স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাছাড়া ইজতেমা আয়োজনস্থলেও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ফলোআপ সভা হয়ে থাকে। গাজীপুরের স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভা, মেট্রোপলিটান ও বিভাগীয় প্রশাসন এর আয়োজনে জড়িত থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সবকিছু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সমন্বয় করা হয়।
৩. বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দীনের প্রচার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন। ইনশাল্লাহ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে এবারের আয়োজন সম্পন্ন হবে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি মেহমানদের জন্য আছে বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। ইউটিলিটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিকভাবে এবার একটি ভালো আয়োজন হবে বলে আমরা আশাবাদী।
আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ
প্রতিমন্ত্রী, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
১. বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করা বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। দীর্ঘকাল থেকে বাংলাদেশের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেন। সাম্প্রতিক সময়ে দাওয়াতে তাবলিগের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় ও মুসল্লিরা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আমরা বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের বিষয়ে বৈঠকে বসি। বৈঠকে উভয় পক্ষই নিজেদের অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে ঐক্যবদ্ধভাবে ইজতেমা করার ব্যাপারে একমত হন। তাবলিগ জামাতের মুরব্বীদের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুসারে এ বছরের বিশ্ব ইজতেমার ১ম ও ২য় দিন অর্থাত্ ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রি. তারিখে তাবলিগের মুরব্বী মাওলানা মো. যুবায়ের, প্রিন্সিপাল ও আহলে শুরা, মাদ্রাসা উলুম-ই-দ্বীনিয়া মালওয়ালী মসজিদ, কাকরাইল, ঢাকা-এর জিম্মাদারিত্বে পরিচালিত হচ্ছে এবং পরবর্তী ২ দিন অর্থাত্ ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ খ্রি. তারিখের ইজতেমার কার্যক্রম পরিচালিত হবে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, আহলে শুরা, তাবলিগ জামাত, কাকরাইল মারকাজ মসজিদ, ঢাকা এর জিম্মাদারিত্বে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে আমরা একটি নজির স্থাপন করেছি। কারণ বিবাদ সত্ত্বেও তাবলিগের দু’পক্ষই একসঙ্গে ইজতেমা করছেন। মূলত আমাদের সবার দিলের চাওয়া যখন এক হয়েছে, তখন আল্লাহ সবার মন নরম করে দিয়েছেন। আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া এটি অসম্ভব ছিল।
২. আমরা ব্যক্তিগত এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে ইজতেমা অনুষ্ঠানের বিষয়ে প্রচেষ্টা চালিয়েছি। তাবলিগের দু’পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের গর্ব বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, ইজতেমা হলেও দু’পক্ষই আলাদাভাবে করার ব্যাপারে ছিল অনড়; কিন্তু হঠাত্ করেই আল্লাহর রহমতে ঘুরে গেল পরিস্থিতি। আমাদের প্রচেষ্টার ফলে একসঙ্গে ইজতেমা করার ব্যাপারে দু’পক্ষই একমত হলো, শুধু তাই নয় এতদিন যাদের একসঙ্গে বসানোও যায়নি, তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের তাবলিগ প্রেমিদের মাঝে ছড়িয়ে গেল আনন্দের বন্যা।
৩. আমি এক কথায় বলতে চাই, তাবলিগওয়ালারা ইসলাম ধর্মের একটি অরাজনৈতিক দীনি প্রতিষ্ঠান। আমার বিশ্বাস এই নির্লোভ, অরাজনৈতিক, ধর্মভিরু মানুষগুলো আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলকে খুশি করতে চেষ্টা করবেন। এটা তাঁদের ঈমানি দায়িত্ব। তাঁরা এ কথাটা মেনে নিয়েছেন। দুই পক্ষের সবাই একটা কথাই বলেছেন যে, আমরা তাবলিগি সব মুসলমান ভাই-বোনের কাছে আহ্বান জানাব, বিভেদের কোনো সুর যাতে না ওঠে। গোলমাল-গোলযোগ কোনো অবস্থাতেই যেন না হয়। তারপরও আমাদের প্রস্তুতি থাকবে। নিরাপত্তা বাহিনী অতীতেও ছিল, এবারও থাকবে। এবার আরো অধিকসংখ্যক উপস্থিতি নিয়ে তারা থাকবে। এ ব্যাপারে আমরা দাওয়াতে তাবলিগের সকল পর্যায়ের সাথীবৃন্দ, দেশবাসী, মিডিয়াসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। আমরা বিশ্বাস করি, সকলের সহযোগিতায় এ বছর আমরা অত্যন্ত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করতে সক্ষম হব-ইনশাআল্লাহ।
জাহিদ আহসান রাসেল
প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এমপি, গাজীপুর-২
১. টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনকে আমরা অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক বলে মনে করি। এ বছর বিবদমান দুটি পক্ষ ১০টি শর্তের আলোকে একত্রে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে সম্মত হয়েছেন। আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে এবারের ইজতেমা নির্বিঘ্নে আয়োজন করতে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করব। ইতোমধ্যেই বিদেশি মেহমানরা আসতে শুরু করেছেন। এবারের বিশ্ব ইজতেমায় মুসল্লিরা যাতে সুষ্ঠুভাবে অংশ নিতে পারেন সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এবার আমরা সংগত কারণে নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ইজতেমার সফল আয়োজন সম্পন্ন করতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
২. প্রতিবছর ইজতেমা আয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা প্রদান করা হয়। বিশ্ব ইজতেমা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার প্রতিবছর ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আসছেন। এবছর এসব সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৩. আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রতিবছর ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইজতেমায় সমবেত হয়ে থাকেন। তাই ইজতেমায় অবস্থানকালে আল্লাহ ও তার রাসূলের (স) নির্দেশিত পথের পথিক হিসেবে আমাদের সব ভেদাভেদ ভুলে শান্তি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে।
