ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় নারীর ভূমিকা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৬

নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রয়াস ও অংশীদারিত্বে মানব জাতির বিকাশ হয়েছে। সমাজ সভ্যতা বিনির্মাণে নারী বা পুরুষ কারো ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা হচ্ছে, মানব জাতি যখন যেখানে আসমানী শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে, সেখানে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং অশান্তির আগুন মানব জীবনকে গ্রাস করেছে। প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে মহানবী মুহাম্মদ (স) যখন ইসলামের দাওয়াতের কাজ সূচনা করেন তখনকার আরব সমাজে নারীরা কতভাবে বঞ্চনার শিকার ছিল, তার চিত্র ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে। এর সামান্য একটি নমুনা ছিল, মেয়ে শিশুর জন্মকে গোটা পরিবারের জন্য কলঙ্কজনক মনে করা হতো। তাই জন্মের সাথে সাথে তাদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। এমন পরিস্থিতিতেই মহানবী (স) ধূলির ধরায় আবির্ভূত হন। তাঁর প্রচারিত ইসলামের ছায়াতলে নারী তার পূর্ণ অধিকার ও সম্মান ফিরে পায়। এ কারণে আমরা দেখতে পাই নারী তার মানবিক সত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটিয়েছে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় কালজয়ী ভূমিকা পালন করে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাসূল (স) -এর যুগে জগতে সর্বপ্রথম মুসলমান ছিলেন একজন নারী- তিনি হলেন নবী করীম (স) এর সহধর্মিণী আমাদের মা হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা)। নবী করীম (স) এর বয়স যখন চল্লিশ বছর তখন তাঁর ওপর প্রথম ওহী নাযিল হয়। ওহী নাযিলের অত্যন্ত কঠিন ও স্পর্শকাতর মুহূর্তে হযরত খাদিজা (রা) যে সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন ইতিহাসে তা এক বিস্ময়কর ঘটনা।

হেরা গুহায় রাসূল (স) এর ওপর যখন প্রথম ওহী অবতীর্ণ হলো, তখন তিনি এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় কিছুটা বিচলিত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরলেন। খাদিজা (রা)কে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন- ‘যাম্বিলুনী, যাম্বিলুনী’— হে খাদিজা! আমাকে কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে ধর, আমি আমার জীবন নিয়ে শঙ্কিত। বুখারী শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত খাদিজা (রা) নবীজীর এ কথা শুনে বললেন- ‘কখনো নয়, ভয়ের কিছু নেই, আল্লাহ আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ আপনি নিজ আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন। দুর্বল-দুস্থ লোকদের সেবা করেন। বঞ্চিত-অভাবীদের সাহায্য করেন। মেহমানদের আতিথেয়তা করেন, দুর্যোগে বিপদগ্রস্তদের পাশে ছুটে চলেন।’ এসব কথা বলে তিনি তখন নবী (স)-কে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।

হযরত খাদিজা (রা) মহানবী (স) এর দাওয়াতী মিশনে যে ত্যাগ, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে তিনি বিশ্বের বুকে আল্লাহ প্রদত্ত ও আল্লাহর রাসূল আনীত বাণীর প্রতি প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার আগেও হেরাগুহায় নবীজী যখন ধ্যানমগ্ন থাকতেন তখন তাঁর খাবার ও পানীয় সরবরাহ করতেন হযরত খাদিজা (রা)।

সাধারণত আমরা দেখি- নারীরা তাদের স্বামীর আয় উপার্জনের দিকেই দৃষ্টি রাখেন বেশি। অথচ স্বামীর প্রতি হযরত খাদিজার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যরকম। তিনি ছিলেন আরবের ধনাঢ্য নারী। তাঁর পুঁজি নিয়েই বিবাহের পূর্বে নবীজী সিরিয়ায় বাণিজ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিবাহ বন্ধনে আবব্ধ হওয়ার পর নিজের সমস্ত সম্পদ উত্সর্গ করেন নবীজীর কদমে। তাঁর জীবন, গোটা জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিলেন ইসলামের সেবায় মহানী (স) এর জন্য। ইসলামের জন্য হযরত খাদিজা (রা) এর আত্মত্যাগ কতখানি তা বোঝার জন্য হাদিসের একটি মর্মবাণী পেশ করা যেতে পারে। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) যখনই খাদিজার কথা স্মরণ করতেন তখন তাঁর প্রশংসা করতেন। একদিন খাদিজার অতিবেশি প্রশংসা শুনে আমার আত্মমর্যাদায় লাগল। আমি নবীজীকে বলে ফেললাম, আপনি একজন বুড়ির প্রশংসায় এভাবে আত্মহারা হয়ে যান! সে তো মরে গেছে, আর আল্লাহ আপনাকে তাঁর চেয়ে অনেক উত্তম স্ত্রী দান করেছেন। একথা শুনে নবীজী বললেন, হে আয়েশা! আল্লাহ আমাকে খাদিজার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করেননি। খাদিজার চেয়ে উত্তম কেউ হতে পারে না; কেননা মানুষ যখন আমাকে অস্বীকার করেছিল, তখন সে আমার উপর ঈমান এনেছিল। লোকেরা যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল খাদিজা তখন আমাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। আমি যখন মানুষের বঞ্চনার শিকার ছিলাম তখন সে আমাকে তার সম্পদ দিয়ে অভাবমুক্ত করেছিল। আর আল্লাহ তার ঘরে আমার সন্তানদের দিয়েছেন।

আল্লাহর রাসূল (স) এসেছিলেন গোটা মানব জাতির জন্য। মানব জাতির অর্ধেক হচ্ছে নারী সমাজ। নবীজী নিজে পুরুষ হওয়ার কারণে নারীদের একান্ত বিষয়াদি সরাসরি শিক্ষা দেয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। ফলে তাঁর সতীসাধ্বী বিবিগণের মাধ্যমে তিনি নারী জাতিকে ইসলামের শিক্ষা দিয়েছেন। এই শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে উম্মুহাতুল মু’মিনীনদের গৌরবময় ভূমিকা ছিল। তবে হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা), হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত উম্মে সালমা (রা) এর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) এর উপাধি দেয়া হয়েছিল ‘সিদ্দিকা’ -পরম সত্যবাদী। তাঁর সূত্রে বহু হাদিস ছাড়া আমরা নারী সংক্রান্ত শরীয়তের অনেক বিধি-বিধান জানতে পেরেছি। আয়েশা (রা) এর অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল, তিনি সাহিত্য চর্চায় অগ্রণী ছিলেন। তাঁর চিকিত্সা বিদ্যাও জানা ছিল, তিনি রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিতেন। সাহাবীদের মধ্যে যে সাতজন ফিকাহসাস্ত্রের শিরোমণি ছিলেন, হযরত আয়েশা (রা) ছিলেন তাদের অন্যতম।

রাসূল (স)-এর আরেক স্ত্রী হযরত উম্মে সালমা (রা) এর অবদানও ভোলার মতো নয়। তিনি তত্কালে মুসলমানদের জাতীয় সমস্যা হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেজন্য আজও তাঁকে ইসলামের রাষ্ট্রপ্রধানের উপদেষ্টার মর্যাদায় স্মরণ করা হয়। রাসূল (স) এর স্ত্রীদের ছাড়াও সাধারণ মুসলিম সাহাবিরা তত্কালে দীনি দায়িত্ব পালনে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা অনেক বিস্তৃত ও গৌরবজনক। নবুওয়াতের পঞ্চমবর্ষে মক্কায় যখন মুশরিকদের অত্যাচার নির্যাতন চরম আকার ধারণ করেছিল তখন নবী (স) এর আদেশে দুই দফায় মুসলমানরা হাবশায় হিজরত করেন। ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই- তখন দেশত্যাগের কঠিন কষ্ট যারা মাথায় নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বিশজন নারীও ছিলেন। ইসলামের জন্য প্রথম যুগে মুসলিম নারীদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে- কোনো পরিস্থিতিতে ইসলামের জন্য তারা ত্যাগ স্বীকারে পিছপা হননি। মক্কায় ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে অনেক ঈমানদার নারী নির্যাতিতা হয়েছেন। তারপরও তাঁরা ইসলাম ত্যাগ করেননি। ইসলামের জন্য প্রথম মহিলা শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন হযরত সুমাইয়া (রা)। যুগে যুগে মুসলিম নারীরা ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যে অবদান রেখে গেছেন, তা থেকে বর্তমান যুগের নারীরা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের আখলাক চরিত্রকে সংশোধনের মাধ্যমে দীনের প্রচার প্রসারে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করবেন, এমনটা প্রত্যাশা করি। আল্লাহ আমাদের জীবন-মরণ সবকিছু ইসলামের জন্য কবুল করুন। আমীন!