আজ হইতে চারদিনব্যাপী বাংলাদেশের রাজধানীর উপকণ্ঠে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হইতেছে ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা ২০১৯। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে হাজার হাজার মুবাল্লিগ ও মুসল্লি এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকিয়া দীন প্রচার ও প্রসার কার্যে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন। ইহাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্মেলন। প্রতি বত্সর বাংলাদেশে এমন সম্মেলন হওয়াটা অত্যন্ত গৌরবজনক। ইহা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করিতেছে। আরবি শব্দ ইজতেমা অর্থ সম্মিলন, সমাবেশ ইত্যাদি। আর তাবলিগ অর্থ প্রচার করা বা পৌঁছাইয়া দেওয়া। ইসলামের বাণী প্রচার-প্রসারের নামই তাবলিগ। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ প্রভৃতি স্থাপন, বক্তৃতা-বিবৃতি, প্রকাশনা ইত্যাদি নানাভাবেই তাবলিগের কাজ করা যায়। আমরা আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (স)-এর উম্মত। তাই স্বাভাবিকভাবে দীন প্রচারের দায়িত্ব এখন আমাদের উপর ন্যস্ত এবং এই দায়িত্বের কারণে উম্মতে মুহাম্মদীর উপর প্রদান করা হইয়াছে শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম, যিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন, নেক আমল করেন এবং বলেন, আমি তো অনুগতদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (৪১ : ৩৩)। আবার রাসূল (স) বলিয়াছেন, ‘আমার পক্ষ হইতে একটি বাণী হইলেও পৌঁছাইয়া দাও’ (সহিহ বুখারি)। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলিয়াছেন যে, প্রতিটি মুসলমানের জন্যেই তাবলিগ তথা অপরের নিকট দীন পৌঁছাইয়া দেওয়া অপরিহার্য কর্তব্য। কমপক্ষে একটি আয়াত বা একটি হাদিসের মাধ্যমে হইলেও।
১৯১০ সালে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণপার্শ্বস্থ এলাকা হরিয়ানার ‘মেওয়াত’ অঞ্চল হইতে হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ) যে দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত শুরু করেন, তাহা মুসলমানদের ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এভাবে তাবলিগ জামাত একবিংশ শতাব্দীর সবচাইতে গতিশীল একটি ইসলামি আন্দোলনে পরিণত হয়। মাওলানা ইলিয়াস (রহ)-এর মূল বক্তব্য ছিল— ‘অ্যাই মুসলমানা তুম মুসলমান বনো’। অর্থাত্ হে মুসলিম ভাইয়েরা তোমরা সত্যিকার মুসলমান হও। দীনকে কায়েম রাখিবার এই আন্দোলনে যাহারা শরিক হইয়াছেন, তাহাদের বিশ্ব সম্মিলনই হইল বিশ্ব ইজতেমা। যাহারা সরাসরি তাবলিগ জামাত করেন না, তাহারাও এই ইজতেমায় অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন ফায়েজ ও বরকত লাভের জন্য। বিশেষত আখেরি মোনাজাতের দিন টঙ্গী অভিমুখী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঢল নামে। তাহারা ইজতেমায় দেশি-বিদেশি মুরব্বীদের বয়ান শুনিবার জন্য উন্মুখ থাকেন।
১৯৪৪ সালে হজরত মাওলানা আবদুল আজীজ (রহ) এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাবলিগের মেহনত শুরু হয়। তারপর ১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের তাবলিগের প্রাণকেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে। একসময় ব্যাপক জনসমাগমের কারণে তাহা টঙ্গীতে স্থানান্তরিত হয়। তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হইতেছে এই বিশ্ব ইজতেমা। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, নির্লোভ, প্রচারবিমুখ ও নিবেদিতপ্রাণ ধর্মীয় সংগঠন হইলেও সামপ্রতিককালে তাবলিগ জামাতে কিছু মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে আল্লাহর অশেষ রহমত এই যে, শেষ পর্যন্ত বিবদমান দুই পক্ষ দুই দিন দুই দিন করিয়া মোট চারদিনে (১৫ ফ্রেব্রুয়ারি হইতে ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি পর্যন্ত) বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠানে সম্মত হইয়াছেন। আশা করি, প্রতিবত্সরের মতো এবারও বিশ্ব ইজতেমা নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণ উপায়েই অনুষ্ঠিত হইবে।
