তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমা আজ শুরু

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:০১

গাজীপুর জেলার টঙ্গীতে তুরাগ নদের তীরে আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে তাবলিগ জামাতের চার দিনব্যাপী ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইজতেমা ময়দানে আসতে শুরু করেছেন। আসছেন বিদেশি মুসল্লিরাও। ইজতেমা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আজ ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বৃহত্তম জুমার নামাজ।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাবলিগ জামাতের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইজতেমা ময়দানে আসা শুরু করেন। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউবা রিকশায়, লঞ্চে চড়ে ইজতেমাস্থলে আসেন। পরে গাড়ি থেকে নেমে নিজের মালপত্র নিয়ে ময়দানে গিয়ে নিজ নিজ জেলা ভিত্তিক খিত্তায় গিয়ে অবস্থান নেন। আয়োজকরা জানান, পুরো ইজতেমা ময়দানকে মুরুব্বীদের পরামর্শে সাজানো হয়েছে। ময়দানে জেলাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থান, রান্না-বান্না করার স্থান, টয়লেট, অজুখানা, গোসলখানা সবই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এবারই প্রথম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে চার দিন। দুই দিন করে পৃথক ভাবে ইজতেমা পরিচালনা করবেন তাবলিগের বিবদমান দুই পক্ষ। আগামীকাল শনিবার দুপুরের আগে আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এক পক্ষের (মাওলানা জুবায়ের) পরিচালনায় ইজতেমা। তারা ইজতেমা ময়দান বুঝিয়ে দিবেন দ্বিতীয় পক্ষের (সাদ্পন্থি) কাছে। তাদের পরিচালনায় ইজতেমা শুরু হবে রবিবার ভোরে। সোমবার আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে সেই ইজতেমা সমাপ্ত হবে।

জেলাওয়ারী ৫০ খিত্তা: এবারের বিশ্ব ইজতেমায়  রাজধানী ঢাকাসহ ৬৪ জেলার মুসল্লিরা অংশ নিচ্ছেন। মুসল্লিদের জন্য ইজতেমা ময়দানকে জেলাওয়ারী ৫০টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। মুসল্লিরা খিত্তাওয়ারী যেভাবে অবস্থান নেবেন: ১ নং খিত্তায় গাজীপুর, ২-৪ নং খিত্তায় টঙ্গী, ৫ ও ৬ নং খিত্তায় ঢাকার মিরপুর, ৭ ও ৮ নং খিত্তায় সাভার, ৯ নং খিত্তায় ঢাকার মোহাম্মদপুর, ১০ নং খিত্তায় ঢাকার ডেমরা, ১১ ও ১২ কেরানীগঞ্জ, ১৩-১৯ ঢাকার কাকরাইল, ২০ নাটোর ও নওগাঁ, ২১ ও ২২ রাজবাড়ি, ২৩ সিরাজগঞ্জ, ২৪ দোহার-নবাবগঞ্জ, ২৫  মানিকগঞ্জ, ২৩৬ টাঙ্গাইল, ২৭ রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট, ২৮ বগুড়া ও জয়পুরহাট, ২৯ মুন্সিগঞ্জ, ৩০ মাগুরা, ঝিনাইদহ ও নড়াইল, ৩১ যশোর, ৩২ নারায়ণগঞ্জ, ৩৩ বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি, ৩৪ ভোলা, ৩৫ নরসিংদী, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট, ৩৬ কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা, ৩৭ ময়মনসিংহ, ৩৮ শেরপুর ও জামালপুর, ৩৯ নেত্রকোনা, ৪০ কিশোরগঞ্জ, ৪১ গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও রাজবাড়ি, ৪২ মাদারিপুর, ৪৩ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, ৪৪ কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান, ৪৫ ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর, ৪৬ কুমিল্লা ও চাঁদপুর, ৪৭ পটুয়াখালী, ৪৮ বরগুনা, ৪৯ পাবনা এবং ৫০ নং খিত্তায় দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়।

১৩৮ বিশেষ ট্রেন, ৪০০ বাস: ইজতেমায় মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য ১৩৮টি বিশেষ ট্রেন, ৪০০টি বিআরটিসি বাস ও পর্যাপ্ত লঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো ইজতেমা ময়দান নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৯ হাজার পুলিশ, দুই শতাধিক র্যাব, ৩ শতাধিক আনসার, ২৮০ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া পর্যাপ্ত সংখ্যক বিজিবি প্রস্তুত থাকবে। দেশের সকল গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইজতেমা মাঠে মোতায়েন থাকবে। সবমিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পুরো ইজতেমা মাঠ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখবে। ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের চলাচলের জন্য ১৭টি প্রবেশ পথে আর্চওয়ে বসানো হয়েছে। থাকবে ১৫টি ওয়াচ টাওয়ার। আকাশপথে কয়েকটি হেলিকপ্টার নিয়মিত টহল দিবে। এছাড়া সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য তুরাগে ৭টি ভাসমান ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। তুরাগে নৌ-টহল ছাড়াও ডুবুরীদল মোতায়েন থাকবে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান সংবাদিকদের জানান, ইজতেমায় যে কোনো ধরনের নাশকতা, নৈরাজ্য রোধে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, ইজতেমা স্থলে মুসল্লিদের নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ খাবার ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধানের জন্য একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রতিদিন ৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। মুসল্লিদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ফ্রি ওষুধ সরবরাহ ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক দায়িত্ব পালন করবেন। সারাবিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশ থেকে মুসল্লিরা ইজতেমায় যোগ দেবেন বলে আশা করছেন তিনি। এ জন্য সরকারি ভাবে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, ইজতেমা চলাকালে বিশেষ ট্রেন থাকছে এবং প্রতিটি ট্রেন টঙ্গী রেলওয়ে জংশনে দুই মিনিট করে যাত্রা বিরতি করবে। বিদ্যুত্ বিভাগ জানিয়েছে, ইজতেমা এলাকায় পাঁচটি ফিডারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। 

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এবছর ১৫টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের অজু-গোসলের জন্য প্রতিদিন প্রায় চার কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট ও গোসলখানা স্থাপন করা হয়েছে।  এছাড়া ৩০টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধনের ওষুধ স্প্রে করা হবে। ৫০টি গার্বেজ ট্রাকের মাধ্যমে ইজতেমা ময়দান থেকে বর্জ্য অপসারণ, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ও ময়দান এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি ক্যাম্পে রান্নার জন্য ১৭৫টি গ্যাসের চুলা স্থাপন করা হয়েছে।

গাজীপুর সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মঞ্জুরুল হক জানান, তাদের চারটি অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক, স্বাস্থ্যকর্মী ও অফিস সহায়করা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবে। মুসল্লিদের সেবা দিতে ১৫টি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন থাকবে।

বিনামূল্যের মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্বোধন: মুসল্লিদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে অর্ধশতাধিক ফ্রি চিকিত্সা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের উত্তরে মন্নুনগর এলাকায় বৃহস্পতিবার বিকালে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. শেখ আব্দুল্লাহ যৌথভাবে হামদর্দ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিনামূল্যের মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্বোধন করেন। এ সময় ধর্ম সচিব, গাজীপুর পুলিশ কমিশনার, হামদর্দ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

দুই মুসল্লির মৃত্যু:বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে আসা দুই মুসল্লি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। তারা হলেন, বি.বাড়িয়া জেলার মো. জব্বার আলী ওরফে রাজ্জাক (৪৪) ও নাটোরের মোহাম্মদ আলী (৫৬)। ইজতেমা মাঠে তাদের নামাজে জানাজা শেষে লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।