গ্রামীণফোন ছাড়ছে বেশি গ্রাহক

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:০২

নম্বর ঠিক রেখে অপারেটর পরিবর্তন বা এমএনপির দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছেন মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের গ্রাহকরা। গত চার মাসে গ্রামীণফোন ছেড়ে চলে গেছেন ৬২ হাজারেরও বেশি গ্রাহক। অন্যদিকে এই চার মাসে রবিতে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৯৪ হাজার গ্রাহক। তবে গ্রামীণফোন ছাড়তে চেয়েও যেতে পারেননি এমন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এ নিয়ে বিরক্ত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারসহ বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট সবাই। কেন গ্রাহকদের জোর করে আটকে রাখছে গ্রামীণফোন সেটাও অনুসন্ধান চলছে। তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে গ্রাহককে আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে।

মোস্তাফা জব্বার গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা আমারও কনসার্ন। অপারেটর বদল করতে চেয়ে আটকে যাওয়া মানুষের সংখ্যা এত বেশি কেন হবে? অন্য অপারেটরের চেয়ে এ দিক দিয়ে গ্রামীণফোন এগিয়ে। তারা জোর করে গ্রাহকদের আটকে রাখতে চায়। অথচ হওয়া উচিত ভালো সেবা দিয়ে গ্রাহককে সন্তুষ্ট রেখে ধরে রাখার চেষ্টা করা। সেটা না করে তারা নানা কৌশলে পোর্টিং আটকে রাখে। এটা কোনভাবেই উচিত না। বিষয়টি আসলে বিটিআরসির দেখা উচিত। আমি নিজেও এ নিয়ে খোঁজ খবর নেব।’

বিটিআরসি থেকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গত পহেলা অক্টোবর এমএনপি শুরু হওয়ার পর গ্রামীণফোন ছেড়ে গেছেন ৬২ হাজার ৩১৭ জন। আর তাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৩৪৬ জন। গ্রামীণফোন ছাড়তে চেয়েও যেতে পারেননি ৩৯ হাজার ৮৫৭ জন গ্রাহক। একইভাবে রবি ছেড়েছে ২৩ হাজার ৯১১ জন। যুক্ত হয়েছে ৯৩ হাজার ৮২৮ জন। আর রবি ছাড়তে চেয়েও যেতে পারেননি ১৪ হাজার ৮৯৬ জন। বাংলালিংক ছেড়ে গেছেন ৪৫ হাজার ৯২ জন গ্রাহক। যুক্ত হয়েছেন ২৫ হাজার ৬১৫ জন। যেতে চেয়েও পারেননি ৪৪ হাজার ৩১ জন। টেলিটক ছেড়ে গেছেন ২ হাজার ৩০১ জন আর যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২ জন। ৬ হাজার গ্রাহক যেতে চেয়েও পারেননি। এক লাখ ৩৩ হাজার ৬২১ জন গ্রাহকের সফল পোর্টিং হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই এমএনপির খরচ কমিয়েছে। বর্তমানে অপারেটর বদলে গ্রাহকের খরচ ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। এর মধ্যে ৫০ টাকা এমএনপির ফি বা মাশুল, মাশুলের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট সাড়ে ৭ টাকা। আর সিম পরিবর্তনের কর ১০০ টাকা যেটা ছিল সেটা তুলে নেওয়া হয়েছে।

কেন এত মানুষ গ্রামীণফোন ছাড়তে চান? জবাবে মোস্তাফা জব্বার ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি তাদের বারবার বলেছি, তোমরা সেবার মান বাড়াও। এক বছর আগে ওয়ার্ল্ড মোবাইল কংগ্রেসে গ্রুপ সিইওকে আমি বলেছি, সেবার মান না বাড়াতে তোমরা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে পারবা না। এবারও সেখানে যাচ্ছি, আবারও বলব। আসলে তারা স্পেকট্রাম কিনতে চাই না। গত নির্বাচনের আগে তারা আমাকে চিঠি দিয়ে স্পেকট্রাম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। একটা মিটিংও হয়েছে। তারপর আর কোন অগ্রগতি নেই। আমি তাদের বলেছি, এক বা দুই মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম কেনার প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে এসো না। বেশি করে কিনতে চাইলে আমি বিষয়টা দেখব। তারা বলে, স্পেকট্রামের দাম বেশি। তাই যদি হয় তাহলে তোমরা লাভ করছ কিভাবে? ব্যবসা করবা, কিন্তু কাঁচামাল কিনবা না তাহলে কিভাবে ব্যবসা চলবে।’

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বিটিআরসির হিসেবে দেখা গেছে, গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩২ হাজার। রবির ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার এবং টেলিটকের ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার গ্রাহক রয়েছে। এই গ্রাহকের বিপরীতে গ্রামীণফোনের স্পেকট্রাম আছে ৩৭ মেগাহার্টজ, রবির ৩৬ দশমিক ৫ মেগাহার্টজ, বাংলালিংকের ৩০ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম। রবি ও বাংলালিংকের গ্রাহক যোগ করলে যে গ্রাহক দাঁড়ায় গ্রামীণফোনের একারই গ্রাহক প্রায় তাই। অথচ তাদের স্পেকট্রাম অন্যদের প্রায় সমান। ফলে স্পেকট্রাম না বাড়ালে গ্রামীণফোনের সেবার মান বাড়বে না বলেই মনে করেন সবাই।

এদিকে গ্রামীণফোনের সেবায় বিরক্ত সাধারণ মানুষও। এমনকি আদালতের বিচারকও মোবাইল ফোনের সেবা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে মোবাইল ফোনের গ্রাহকদের অধিকার রক্ষার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনের উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শুনানিতে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান মোবাইল ফোনের কলড্রপ-অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ ও বর্ধিত কলরেট-ট্যারিফ চার্জ আরোপ নিয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন এজলাসে আদালতে উপস্থিত শতাধিক আইনজীবী দাঁড়িয়ে বিচারপতিদের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেন। এ সময় এজলাসে থাকা বিচারপতিরা বলেন, আমরাও এই বিড়ম্বনার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছি না। আজও কথা বলার সময় একাধিকবার কলড্রপের শিকার হতে হয়েছে। ওই রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট মোবাইল ফোনের কলরেট বৃদ্ধির ও কলড্রপে চার্জ কাটার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এছাড়া কলড্রপ-অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ-বর্ধিত কলরেট-ট্যারিফ চার্জ না বাড়ানো এবং ঘোষিত ফোরজি সেবা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।