বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তি মেলা ২০১৯-এ অংশগ্রহণ করেছে ৭৮ উদ্ভাবনী প্রকল্প

খুদে গবেষকরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৯

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)-এর ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে গত বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, ৩ দিনব্যাপী (১৪ - ১৬) বিসিএসআইআর ‘বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তি মেলা ২০১৯’ এর উদ্বোধন করেন। মেলায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রসেস লিজসহ ৭৮টির অধিক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকল্প, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, গবেষণা ও পণ্য প্রদর্শন করছেন।

বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেছেন বিসিএসআইআর এর চেয়ারম্যান মো. ফারুক আহমেদ।

এসময় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞান গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজনীয় অধুনিক যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত ফান্ড দিচ্ছেন। আধুনিক গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বমানের গবেষণা ও প্রযুক্তির সমপ্রসারণ ঘটছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা বিশ্বময় বিচরণ করছে। তাদের জ্ঞান, প্রতিভা সর্বময় কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। শিশুদের জন্য আমরা আমাদেরকে উত্সর্গ করছি। আমাদের অসমাপ্ত কাজ পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যেতে হবে। সর্বক্ষেত্রে আদর্শ মানুষ হয়ে আমাদের অপূর্ণতাকে তারাই পূর্ণ করবে। দেশের উন্নয়নের জন্য মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি টেকসই প্রযুক্তি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। বিজ্ঞানীদের এখন কিছু দিতে হবে তাদের কর্মের গতি বাড়াতে হবে অন্যথায় সরে যেয়ে নতুনদের জন্য জায়গা করে দিতে হবে।’

মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভিশন ২০২১ , ২০৪১ এবং ডেল্টাপ্লান ২১০০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আজকের এ খুদে গবেষকরা গবেষণার মাধ্যমে জীবন মানের উন্নয়ন ঘটিয়ে একদিন বাংলাদেশকে প্রযুক্তির শীর্ষে পৌঁছে দিবে। মেলায় প্রদর্শিত প্রকল্পগুলো আমরা আরো এগিয়ে নিয়ে যাব। আমরাই পারি আমরাই পারব আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গড়তে। এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’

অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, ‘এখন গবেষণার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যা পূর্বে ছিল না। আমাদের প্রয়োজন গবেষকদের উত্সাহ ও প্রেরণা দেয়া।’ তিনি খুদে গবেষকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমাদের অনেক বিখ্যাত গবেষক প্রয়োজন এ দায়িত্ব তোমাদের হাতে রইল। তোমরাই পারবে আমাদের সংকল্পকে সার্থক করতে। এ দেশে অনেক অ-ব্যবহারিত সম্পদ রয়েছে, যেমন: সিলিকা-সেন্ট, ইউরেনিয়াম প্রভৃতি লুকায়িত মূল্যবান সম্পদ আহরণ করে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।’

সভাপতির বক্তবে চেয়ারম্যান বিসিএসআইআর বলেন, ‘আমরা নতুন প্রজন্মের চিন্তার মধ্যে ভবিষ্যত্ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমাদের দায়িত্ববোধ থেকেই প্রতি বছর এ মেলার আয়োজন করছি। এ ধরনের মেলার মাধ্যমে আমরা একদিন বাংলার নিউটন আইনস্টাইনকে খুঁজে পাব যারা দেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

মেলায় ৯ম থেকে ১০ম শ্রেণি, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি এবং স্ব-শিক্ষিত উদ্ভাবক/বিজ্ঞান ক্লাবসহ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিসিএসআইআর-এর প্রসেস নিয়ে গড়ে ওঠা স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৭৮টির অধিক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে।

ঢাকার স্বনামধন্য স্কুল-কলেজ যেমন হলিক্রস, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, আইডিয়াল, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদসহ ঢাকা ও ঢাকার বাহিরের প্রসিদ্ধ স্কুল-কলেজসমূহ এ মেলায় অংশগ্রহণ করছে। ৩টি স্তরে ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারী বিজয়ীদের মোট ৯টি দলের জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া অংশগ্রহণকারী সকলকে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।

মেলা ঘুরে প্রকল্পগুলো দেখে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে তাদের প্রকল্পের বর্তমান অবস্থান ও আগামী পরিকল্পনা নিয়ে। কয়েকটি প্রকল্প সম্পর্কে আংশিক চিত্র তুলে ধরা হলো।

মাল্টিপারপাস সাইবার রোবট

মাল্টিপারপাস সাইবার রোবট প্রকল্প নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর একটি দল। দলটি এসেছে বগুড়া  থেকে। দলটির প্রধান মো. আবির ইসলাম মিশাদ তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা মাল্টিপারপাস সাইবার রোবট নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। রোবট বিভিন্ন কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা রোবটিক প্রযুক্তিকে আধুনিক চিকিত্সার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এই রোবটটির মাধ্যমে অপারেশন করা যাবে নিখুঁতভাবে। রোগীর কাছে থাকা রোবটটির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা। এই কাজের জন্য রোবটের অপর প্রান্তে যে ডাক্তার সংযুক্ত হবেন তাকে হাতে পড়তে হবে স্মার্ট গ্লাবস। গ্লাবস এর সঙ্গে রয়েছে অনেক প্রযুক্তি। ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ডিসপ্লেতে দেখে ডাক্তার যেভাবে তার হাতে গ্লাবস মুভ করবেন রোগীর কাছে থাকা রোবট ওই একই কায়দায় এবং নিখুঁতভাবে তার হাত মুভ করবে। এতে করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা রোবটের মাধ্যমে অপারেশন করতে পারবে। ’

স্মার্ট ব্লাইন্ড স্টিক

ব্লাইন্ড স্টিক নামের উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছে আইডিয়াল কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে একটি দল। দলটির দলপ্রধান মোহাম্মদ সবুজ আলীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্পটি নিয়ে। প্রকল্পটি সম্পর্কে মোহাম্মদ সবুজ আলী বলেন,‘ আমরা অন্ধ মানুষদের জন্য একটি বিশেষ স্টিক তৈরি করেছি। এই স্টিক দিয়ে  অন্ধ ব্যক্তিরা হাঁটা-চলায় সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি অডিও বার্তাও শুনতে পারবেন। এই ধরনের স্টিক ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীর সামনে কী ধরনের বস্তু রয়েছে তা অডিও বার্তার মাধ্যমে জানতে পারবে। এছাড়াও স্টিকটির সঙ্গে রয়েছে জিপিএস ট্যাকার ও কম্পনের জন্য আলাদা মটর। অনেক অন্ধ মানুষ আছে যারা কানেও শুনতে পায় না। স্টিকে ব্যবহার করা মটরের মাধ্যমে যে কম্পন হবে তা থেকে সে বুঝে নিবে তার সতর্ক বার্তাটি।’

হ্যান্ডস ফর ডিজঅ্যাবল পিপল

হ্যান্ডস ফর ডিজঅ্যাবল পিপল নামের উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছে আরো একটি দল। দলটির প্রধান সাকিব এর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে বিশেষ প্রযুক্তির ওই হাতটি নিয়ে। সাকিব তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প হ্যান্ডস ফর ডিজঅ্যাবল পিপল সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক মানুষ রয়েছে যাদের হাতে আঙ্গুল নেই। আবার কোনো কারণে হাতের আঙ্গুল কাজ করছে না। আমরা তাদের জন্য একটি বিশেষ প্রযুক্তির হাত তৈরি করেছি। প্রযুক্তির এই হাতটি দিয়ে এজন প্রতিবন্ধী খুব সহজেই অনেক কিছু ধরতে পারবে। আমরা এর আধুুনিক সংস্করণ নিয়ে কাজ করছি। আপাতত হাতের কব্জির মাধমে এটি পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা আগামীতে যে সংস্করণ নিয়ে আসছি সেটিতে পেশী থেকে সংকেত নিয়ে কাজ করবে। তখন হাতের কব্জিতে আর বেশি শক্তি দিতে হবে না। প্রকল্পটির কাজ আমরা ফাইনাল স্টেজে নিয়ে এসেছি, চাইলে এখন থেকেই বাজারজাত করতে পারবো।’

 

ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার

ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার প্রকল্প নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছে বঙ্গবন্ধু কলেজ, রাজশাহীর একটি দল। বিশেষ প্রযুক্তির হুইল চেয়ারটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধীরা খুব সহজেই  এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারবে, এতে কারো সাহয্য করার দরকার হবে না। ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার প্রকল্পটি নিয়ে কথা হয় প্রকল্পের দলপ্রধান রেজুয়ান আহমেদের সঙ্গে। রেজুয়ান আহমেদ বলেন, ‘বাজারে অনেক ধরনের হুইল চেয়ার পাওয়া যায়। আমরা যে ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার নিয়ে কাজ করেছি সেটি একটু আলাদা। প্রতিবন্ধীদের চলাফেরা করার জন্য অন্য ব্যক্তিদের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার দিয়ে যারা চলাচল করবে তাদের অন্য করো সহযোগিতার প্রয়োজন হবে না। এজন্য আমরা একটি বিশেষ প্রযুক্তির ক্যাপ ব্যবহার করেছি। এই ক্যাপটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তার মাথায় ব্যবহার করতে হবে। এর পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তার মাথা যেদিকে মুভ করবে হুইল চেয়ারটিও সেদিকে মুভ করবে। ইলেকট্রিক হুইল চেয়ারটিতে আধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। 

অ্যাডভান্স সিকিউরিটি সিস্টেম

অ্যাডভান্স সিকিউরিটি সিস্টেম নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণ করেছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দল। এই প্রযুক্তিতে স্মার্ট হোম সিস্টেম এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। উদ্ভাবনী প্রকল্পটি নিয়ে কথা হয় দলটির প্রধান হুসাইন মেজবাহ তামীম এর সঙ্গে। তামীম বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আমাদের বসত বাড়ি বা অফিসের নিরাপত্তার জন্য আমাদের এ প্রযুক্তিটি খুবই উপযুক্ত। মোশন সেন্সর, ক্যমেরা ও ব্লুটুথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে এ প্রযুক্তিটি। আমাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ডিভাইসটি যদি কারো বাসা বা অফিসের মূল দরজায় লাগানো থাকে আর কেউ যদি তার দরজায় আসে তাহলে ডিভাইস ব্যবহারকারীর ফোনে কল বা এসএমএস চলে আসবে। ব্যবহারকারী দরজার কাছে গিয়ে নিশ্চিত করে দড়জা খুলতে পারবে। এছাড়াও দরজায় পাসওয়ার্ড কোড ব্যবহার করা যাবে। যারা পাসওয়ার্ড জানবে তারা তা দিয়েই বাসার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে। এই প্রযুক্তিটি চাইলে জানালা ও বারান্দাতেও লাগানো সম্ভব। ’