ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতন হোন

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:১৫

আমাদের শরীর অসংখ্য ছোট ছোট কোষ দিয়ে তৈরি। একই ধরণের অনেকগুলো কোষ দিয়ে তৈরি হয় শরীরের ‘কলা’। যেমন, পেশি কলা (মাংস পেশি), স্নায়ু কলা (মস্তিষ্ক, মেরু রজ্জু, নার্ভ), অস্থি কলা (হাড়), যোজন কলা (রক্ত, লসিকা)। এরূপ অনেকগুলো ‘কলা’ একসঙ্গে মিলে তৈরি করে একটি ‘অঙ্গ’। আর অনেকগুলো ‘অঙ্গ’ মিলেই তৈরি আমাদের শরীর। আমাদের শরীরের কোষগুলো স্বাভাবিক নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয়। যখন শরীরের কোন অংশের কোষ কোন কারণে অস্বাভাবিক, অনিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, তখন তাদেরকে বলে ‘টিউমার কোষ’। সাধারণভাবে টিউমার কোষগুলো একিত্রত হয়ে একটি চাকার মত তৈরি করে। এই চাকাকেই সাধারণভাবে বলে টিউমার। সব ‘টিউমার’ই ক্যান্সার নয়। কোন কোন টিউমারের কোষ নিরীহ বা ‘বিনাইন’ প্রকৃতির। এসব কোষ আশেপাশের কলাকে ভেদ করতে পারে না। ‘বিনাইন টিউমার’ ক্যান্সার নয়। কোন কোন টিউমার কোষ ক্ষতিকর বা ‘ম্যালিগন্যান্ট’ প্রকৃতির। এসব কোষ আশেপাশের কলাকে ভেদ করতে পারে। ক্ষতিকর বা ‘ম্যালিগন্যান্ট’ টিউমারকে বলে ‘ক্যান্সার’। অনেক টিউমার প্রথমে ‘বিনাইন’ টিউমার হিসাবে শুরু হয় এবং পরে ‘ম্যালিগন্যান্ট’ হয়ে যায়।

ক্যান্সার একটি মারাত্মক ও ভীতিকর রোগ। শরীরের যে কোন অঙ্গেই ক্যান্সার রোগ হতে পারে। যেসব ক্যান্সার বেশি হয় সেগুলোর মধ্যে আছে মহিলাদের জরায়ুর মুখের ক্যান্সার, মহিলাদের স্তনের ক্যান্সার , পুরুষদের প্রস্টেটের ক্যান্সার, লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার এবং কোলন ক্যান্সার বা বৃহদন্ত্রের ক্যান্সার। সারা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্যান্সার।

ক্যান্সারের কিছু প্রাথমিক লক্ষণ বা বিপদ চিহ্নগুলো হলো:

lস্তনে কোন চাকা অনুভব করা বা স্তনের বোঁটা দিয়ে রস বের হওয়া বা স্তনের ত্বক কুঁচকে যাওয়া বা কমলার খোসার মত হয়ে যাওয়া- এগুলো স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

lত্বকের আঁচিলে হঠাত্ করে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা ত্বকের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

lদীর্ঘ দিন ধরে গলার স্বর ভাঙ্গা থাকা হতে পারে গলার ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

lমলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন লক্ষ্য করা- এটা হতে পারে কোলন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

lমাসিকের সময়ের বাইরেও মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া- এটা হতে পারে জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

ক্যান্সার হওয়ার পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই কিছু কারণ বা ঝুঁকি কাজ করে। এগুলোর মধ্যে আছে-

lধূমপান করা: ধূমপান করলে ফুসফুস, মুখগহ্বর, গলা, শ্বাসনালী, পাকস্থলি, কোলন এবং প্রস্টেটের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lপান-জর্দা-পাতা খাওয়া:পান-জর্দা-পাতা খেলে মুখগহ্বর, গলা, শ্বাসনালী ও পাকস্থলির ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lমদ্যপান করা: মদ্যপান করলে মুখগহ্বর, গলা, শ্বাসনালী ও পাকস্থলির ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lশাকসবজি, ফলমূল ও আঁঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া: শাক-সবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার কম খেলে কোলন, স্তন, জরায়ু ও প্রস্টেটের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lখাবারে তেল-চর্বি বেশি থাকা: খাবারে তেল-চর্বি বেশি থাকলে কোলন ও স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lশারীরিক ব্যায়াম না করা: নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম না করলে শরীরে তেল-চর্বি জমে, শরীরের ওজন বেড়ে যায়। ফলে কোলন ও স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

lশারীরিক স্থূলতা বা শরীরের ওজন বেশি থাকা: শরীরের ওজন বেশি থাকলে স্তন ও কোলন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lআল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রে ইত্যাদি রেডিয়েশন: ত্বকের ক্যান্সার ও রক্তের ক্যান্সার (লিউকেমিয়া) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lকিছু রাসায়নিক পদার্থ যেমন ফরমালডিহাইড, আফলাটক্সিন, বায়ু দূষণ: খাদ্যনালী, লিভার ও ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

lকিছু ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু:  হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কারণে লিভারের ক্যন্সার, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কারণে জরায়ুর মুখের ক্যান্সার এবং হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি জীবাণুর কারণে পাকস্থলির ক্যন্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

উপরোল্লেখিত কারণ বা ঝুঁকিসমূহের জন্য যে কোন ব্যক্তিরই  ক্যান্সার হতে পারে। এগুলো ছাড়াও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হলে জরায়ুর মুখের ক্যান্সার, বুকের দুধ কম পান করালে স্তন ক্যান্সার, পারিবারিক ইতিহাস থাকলে স্তন ক্যান্সার, বয়স বাড়ার কারণে লিউকেমিয়া, কোলন ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, জরায়ুর মুখের ক্যান্সার ও প্রস্টেটের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। নিচের বিষয়গুলো ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে:

১. শরীরের ওজন কম রাখা। তবে খেয়াল রাখতে হবে, শরীরের ওজন যেন স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্য ওজনের চেয়ে বেশি কমে না যায়।

২. শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকা। শরীরটাকে সচল রাখতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে হাঁটাহাটি বা ব্যায়াম করতে হবে।

৩. বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া। যেমন শাকসবজি, ফলমূল, শস্যদানা, বিচিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। চর্বি, চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার কমিয়ে দেওয়া।

৪. ধূমপান, মদ্যপান পরিহার করা।

৫. অহেতুক বা বেশি বেশি আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রে বা বায়ু দুষণের শিকার না হওয়া।

৬. দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো।

৭. হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা নেওয়া।

এছাড়া, ক্যান্সারের উপরোল্লেখিত কারণ বা ঝুঁকিগুলোর কথা মনে রাখলে ক্যান্সার প্রতিরোধের আরও কিছু উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। ক্যান্সার স্ক্রিনিং করাও ক্যান্সার প্রতিরোধের একটা ভাল উপায়। শরীরে ক্যান্সার আছে কী না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াকে বলে ক্যান্সার স্ক্রিনিং। ‘প্যাপ স্মীয়ার’ পরীক্ষা ও ‘ভি.আই.এ.’- এ দুটো হচ্ছে জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং পরীক্ষা। ম্যামোগ্রাফি করা ও নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা- এ দুটো হচ্ছে স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং পরীক্ষা। বুকের এক্স-রে করা ও কফ পরীক্ষা করা হচ্ছে ফুসফুস ক্যান্সারের স্ক্রিনিং পরীক্ষা। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে দ্রুত এবং সঠিক চিকিত্সার মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময় সহজতরভাবে সম্ভব।

 

¡অধ্যাপক ডা.মো.শহীদুল্লাহ্

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ,

কমিউনিটি বেজ্ড মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ।