বাংলা ভাষা নিঃসন্দেহে বিশ্বের সমৃদ্ধ ভাষার মধ্যে অন্যতম। এ ভাষা আরো সমৃদ্ধ হয়েছে এর আঞ্চলিক ভাষাগুলোর জন্য। চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, যশোর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষার মধ্যে রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। নানান বৈচিত্র্য। প্রতিটি অঞ্চলের ভাষায় আলাদা আলাদা টান রয়েছে। শব্দ ও উচ্চারণেও রয়েছে ভিন্নতা। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলে এর বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
এ নিয়ে অবশ্য মাঝে মাঝে সমস্যায়ও পড়তে হয়। একবার চট্টগ্রাম গিয়ে আমিও তেমন সমস্যায় পড়েছিলাম।
তবে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বেশি কিছু মজার উপাদানও আছে। যেমন, এক ছেলেকে কুকুর কামড়েছে। সবাই জিজ্ঞেস করল, কীভাবে এমন হলো? ছেলেটির উত্তর: আই খেলা হাইদ্দে এন্ডইল্লা সমথ কুত্তা উজ্ঞা আইয়ারে আঁঁরে কঁরাই দিইয়ে। মানে হলো- সে যখন খেলা খাচ্ছে তখন একটা কুকুর এসে কামড়ে দিয়েছে। এখানে খেলাটাও খাওয়া! এরা খেলাও খায় আবার কেলা (কলা)-ও খায়!
শুনেছি, এক বড়লোক বাবার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে চান্স পেয়েছে। তাকে ঢাকা আসতে হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাবা বেঁকে বসে। বাবার সাফ কথা: পড়াশোনা ন’ লাইবো। পোয়া তো পইস গণিত পারে। মানে হলো- পড়াশোনার দরকার নেই কারণ ছেলে টাকা-পয়সার হিসেব রাখতে পারে।
চট্টগ্রামেরই আরেকটি ঘটনা। একজন বিখ্যাত ব্যক্তি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন। তিনি তার এক কিশোর সহযোগীকে বললেন, গ্যায়া কুদ্দুস এক ক্বাম করো, তুঁই আঁঁর পোন্দে পোন্দে আইয়ো। এখানে কেউ অশ্লীলতার গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করবেন না। বিখ্যাত ভদ্রলোকটি এখানে ‘পোন্দে পোন্দে’ বলতে বুঝিয়েছেন ‘পেছন-পেছনে’। মানে ওই ভদ্রলোক বলেছেন: কুদ্দুস তুমি এক কাজ করো, তুমি আমার পেছন পেছন আস।
চট্টগ্রামের পর এবার ফেনী প্রসঙ্গ। একবার নাকি ফেনীর এক কলেজে নির্মাণ কাজ নিয়ে অর্থ-আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। তখন এক প্রতিবাদী মিছিলে স্লোগান উচ্চারণ করা হয়-‘হেনী কলেজের টিয়া লই চুদুরবুদুর, চইলত ন বন্ধ কর (ফেনী কলেজের টাকা নিয়ে বাড়াবাড়ি চলবে না, বন্ধ কর) !
একবার এক ভদ্রলোকের কথার টান শুনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার বাড়ি কি ফেনী? তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, আন্নে কেন্নে বুইঝতাইচ্ছেন আঁঁর বাই হেনী! আঁঁর কতা হুনি কেইই বুজে না আঁঁর বাই হেনী (আপনি কিভাবে বুঝলেন আমার বাড়ি ফেনী। আমার কথা শুনে কেউ বোঝে না আমার বাড়ি ফেনী)!
নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ ‘প‘ কে ‘ফ’ বলে আমরা সবাই জানি। নোয়াখালীতে পাঁচ টাকা যে ‘হাঁস-টিয়া’ হয়-এটা আমরা অনেকেই জানি।
তবে নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলের মানুষের ‘প’ এবং ‘ফ’-এর ব্যবহারটা খুবই উপভোগ্য।
দুই ভদ্রলোকের মধ্যে কথা হচ্ছে।
-আন্নেরে কুতায় য্যান দেখসি। সম্ববত কুনু ফার্টি কিংবা পাংসানে।
এ হলো ‘প’ কিংবা ‘ফ’ সমস্যা। একজন আরেক জনের উপর ক্ষেপে বলে- তুই এওগ্গা আস্তা ফাগল।
-তুই আঁঁরে ফাগল খইলি!
শুরু হয়ে গেল ক্যাঁচাল।
একজন সিলেটি আর নোয়াখালী ব্যক্তির মধ্যে আলাপ হচ্ছে। সিলেটিদের লন্ডন-কানেকশানের কথা আমরা জানি। এ কারণে তারা ইংরেজিতে ভালো। তো তেমন এক আত্মগর্বী সিলেটি লন্ডনের এক হোটেলে নোয়াখালীর এক ব্যক্তিকে বলছেন: দি নোয়াখাইল্লা’স আর নট স্পিক ইংলিশ হরেক্টলি!
এবার নোয়াখালীর ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বললেন, ইট ইজ বেরী হেতেটিক এন্ড হিকুলিয়ার। বাট আন্নের কতা রঙ!
আসলে নানা রঙের উপভাষা বা আঞ্চলিকতায় পূর্ণতা পেয়েছে বাংলা ভাষা। মূলত ভাষা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা থাকে না, তার পরিবর্তিত রূপ নির্ভর করে আচার ও সংস্কৃতির উপর। ঘরের বাইরে প্রমিত ভাষার ব্যবহার হলেও ঘরে আমরা নিজেদের আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অনেক সময়ই ঘরে বলা আঞ্চলিকতার টান বাইরে এসে আমাদের প্রমিত ভাষাতেও ঢুকে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, যারা দীর্ঘদিন উপভাষায় কথা বলে অভ্যস্থ তারা যখন প্রমিত ভাষা বলে তাতে একটা টান বা উচ্চারণ ত্রুটি থেকে যায়। শুধু টানই নয়, কিছু উচ্চারণ ভ্রংশও আছে যেমন- রাজশাহী অঞ্চলে ‘ছ’-কে ‘স’ বলা হয়। রংপুর-দিনাজপুরে ‘র’ কে ‘অ’ আবার ‘অ’ কে ‘র’ উচ্চারণ করা হয়। রক্ত হয়ে যায় অক্ত, আর রাজা হয় আজা!
আঞ্চলিকতা নিয়ে অনেকেরই অনেকরকম অভিজ্ঞতা আছে। তবে আমার এক বন্ধুর রয়েছে বিরল অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি আমার বন্ধু ফেসবুকে বিস্তারিত লিখেছেন।
বন্ধুর অভিজ্ঞতাগুলো জেনে নেওয়া যাক।
চিটাগাং গিয়েছি শুঁটকি কিনব বলে একটা দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম: “এটার দাম কত?’
‘সাসশো’
“কত? সাতশো ?’’
‘উহু, একদাম সাসশো’
কত? চারশো?”
‘‘বাই সিম্পল খতা বুজেন না?
ইচ্ছে হচ্ছিল, শুঁটকি রেখে এই কিউট বান্দাটাকে কোলে করে ঢাকা নিয়ে আসি!
শুধু চিটাগাং নয়, বাংলাদেশের যে প্রান্তেই যান, ভাষা নিয়ে আপনার একই অভিজ্ঞতা হবে। একবার সিলেটে গিয়ে কিছুদিন ছিলাম। সেখানে একজনের সঙ্গে খানিক সুসম্পর্ক হয়েছিল। একদিন তিনি বললেন, “আফনারে আমি বালাফাই, অন্য কেউরর লগে মাততাম ফারিনা”
তখন বুঝিনি, ভদ্রলোকের এত মাতামাতির ইচ্ছে কেন!
দিনাজপুরের লোক, অপরিচিতদের তুই করে বলে! কিন্তু বাক্যের শেষে আপনিতে ফিরে আসে। যেমন “কিরে তুই হামার বাড়িত আসিলেন না”
ময়মনসিংহের মানুষ তো কথায় কথায় ইংরেজি বলে; “বাড়িত গ্যাস লাইন?” কোনো ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া কেউ হয়ত হুট করে শুনলে ভাববে তার বাসার gas line নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা হচ্ছে! কিন্তু আদতে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে ‘বাড়ি গিয়েছিলেন?’
এবার কিশোরগঞ্জের অভিজ্ঞতা। ‘ইঞ্জেকশান ভয় পায়’ এমন একজন কিশোরগঞ্জবাসীকে একবার জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।
ডাক্তার: আপনার সমস্যা কি?
রোগী: মাতা বেদ্না। এইবাই বালা অইয়া যায়াম, ইঞ্জিশন লাকতো না!
ডাক্তার: আর কোনো সমস্যা?
রোগী: শইল্ল জ্বর। বরি খাইলেই বালা অইয়া যায়াম, ইঞ্জিশন লাকতো না!
ডাক্তার: বাথরুম ঠিকমত হয়? বেশি নরম না তো?
রোগীঃ অয় মানে, কি কইন? মিল্লা মারলে আইন্নের কফাল পাইট্টা যাইবো-এরুম শক্ত! ইঞ্জিশন লাকতো না!
নোয়াখালীর মানুষ নিয়ে কথা বলা শুরু করলে লেখা শেষ করা যাবে না। আগেই বলেছি সামান্য পানি, তাদের কাছে honeু!
একবার বরিশাল গিয়েছিলাম। অল্পটাকায় দুপুরের খাবার খেতে এক ভাঙা-চোরা হোটেলে ঢুকে হোটেল-বয়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কি তরকারি আছে?”
তার উত্তর, ‘ট্যাংগা শালুনের হুররা চুক্কা!’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। মনে মনে ভাবছি এটা কি কোড ল্যাঙ্গুয়েজ? আলফা রোমিও টেঙ্গ ধরনের কিছু?
পরে শুনলাম তারা তেঁতুলকে বলে ট্যাংগা, তরকারির ঝোলকে বলে শালুনের হুররা আর টককে বলে চুক্কা!
এবার বিলাতি অভিজ্ঞতা। আমার বন্ধুর জবানিতে।
কয়েকদিন আগে ইংল্যান্ডে এক বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। তারা সিলেটি। সেই বাসার পিচ্চি বাচ্চার জন্য তাড়াহুড়ো করে আমি কিছু প্ল্যাস্টিকের খেলনা পোকামাকড় নিয়ে গেলাম। এই উপহার দেখেই সে বলে উঠলো, ‘আই অ্যাম স্কেএএআর্ড (scared)’ আমি তার উচ্চারণ শুনে মুগ্ধ! একবারে ব্রিটিশ টান! আমি আবার তার প্রোনান্সিয়েশান শোনার জন্য ওর দিকে একটি প্লাস্টিকের তেলাপোকা এগিয়ে ধরলাম। সে আবার বলে উঠলো, ‘আই অ্যাম স্কেএএআর্ড, আমি বুইফাই!’
তবে আঞ্চলিকতার বাইরে বাংলাভাষা নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতাও আছে। আছে আবেগ, রস আর মাধুর্যমণ্ডিত বর্ণনা। তেমনই একজনের মনোমুগ্ধকর বর্ণনা: যে ভাষায় আমের নাম হিমসাগর আর গ্রামের নাম বীরসিংহ, ফুলের নাম অপরাজিতা আর দুলের নাম ঝুমকো, পাখির নাম বউকথাকও মিষ্টির নাম বালুসাই আর বৃষ্টির নাম ইলশেগুঁড়ি, মাছের নাম রূপচাঁদা আর গাছের নাম শিশু, কবির নাম জীবনানন্দ আর ছবির নাম সাড়ে চুয়াত্তর, ঋতুর নাম হেমন্ত আর থিতুর নাম বিবাহিত, মাসের নাম শ্রাবণ আর ঘাসের নাম দুর্বা, গানের নাম ভাটিয়ালি আর ধানের নাম বিন্নি, নদীর নাম কীর্ত্তনখোলা আর যদির নাম দিবাস্বপ্ন, রোগের নাম সন্ন্যাস আর যোগের নাম মণিকাঞ্চন, সাপের নাম শঙ্খচূড় আর বাপের নাম আপনি বাঁচলে, হাসির নাম অট্টহাসি, তাকে ভালো না বেসে পারি?
সত্যিই, বাংলাকে না ভালোবেসে পারা যায় না।
লেখক: রম্যরচয়িতা
