প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রধান উত্সই হলো নদ-নদী। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় যুগ যুগ ধরেই নদ-নদীগুলো মায়ের মতো বাংলাদেশকে হূষ্টপুষ্ট করে রেখেছে। এই নদ-নদীগুলোই এদেশের প্রাণ। বেশিরভাগ শহর, নগর, বন্দর, গঞ্জ এমনকি গ্রামগুলোও নদীর তীরেই অবস্থিত। অসংখ্য শাখা-প্রশাখা ও ছোট বড় মিলিয়ে সাতশোরও বেশি নদ-নদী বয়ে চলেছে এদেশের ওপর দিয়ে। সারা দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে এক সময় আমাদের নদীপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় বড় বড় নদ-নদীগুলোই সারা বছর কৃষিকাজে পানির জোগানও দিয়েছে। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর সেই ঐতিহ্য আর নেই। দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা আর দখল-দূষণে বেশিরভাগ নদ-নদীই মৃতপ্রায়। বর্তমানে বর্ষাকালে নদ-নদীগুলোতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়; কিন্তু শুকনো মওসুমে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ হাজার ঘনমিটারে।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, দীর্ঘদিন ধরে নদী সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে আমাদের দেশের অনেক নদ-নদী হারিয়ে গেছে অথবা শুকিয়ে গেছে। একদিকে ব্যাপকভাবে নদী দখল আর অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ অপমৃত্যু ঘটাচ্ছে নদ-নদীগুলোর। অনেক নদ-নদীরই বর্তমানে অস্তিত্ব নেই। আর কিছু নদ-নদী আছে যেগুলো বর্ষার দু-তিন মাস বোঝা যায় যে এখানে এক সময় একটি নদী ছিল, কিন্তু বর্ষা শেষ হতে না হতেই নদীগুলো শুকিয়ে ধুধু বালুচরে পরিণত হয়। নদ-নদীগুলোর এই করুণদশা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে বড় বড় ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। যার ফলে এই নদ-নদীগুলোতে কোনো মাছ বা জলজ উদ্ভিদ নেই বললেই চলে। বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকার আশেপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীতে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার শিল্প কারখানা থেকে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার ঘন মিটার বর্জ্য আসে। অন্যান্য উত্স থেকে আসে আরো প্রায় ৫০ হাজার ঘন মিটার। আমাদের নদ-নদী নিয়ে বক্তৃতা, আলোচনা-গবেষণা অনেক হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নদ-নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি দেখা যায় না। দখল ও দূষণের জন্য যারা দায়ী, তারা যেমন বিত্তশালী তেমনি প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সহজে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। এর ফলে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত বা দূষণমুক্ত করা খুবই কঠিন কাজ।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নদীপথের পরিবর্তে সড়কপথের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে একের পর এক সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে শুধু সেতু দিয়ে এ দেশকে বাঁচানো যাবে না, এ দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেতুর চেয়েও নদ-নদীর গুরুত্ব অনেক বেশি। আমাদের নদ-নদীর করুণ অবস্থার জন্য অন্য দেশকে দায়ী করে হৈচৈ করলে বা নিজেদের হাত গুটিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকলে কোনো কাজ হবে না। আমাদের নদী আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।
দেশের প্রায় নব্বই ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা ও যাতায়াতব্যবস্থা নদ-নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় কাজ যদি আমরা নিজেরাই করতে পারি, তাহলে নদ-নদীগুলো রক্ষা করার সামর্থ্য আমাদের থাকবে না কেন? সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নদ-নদীগুলোর খনন কাজে হাত দিতে হবে এবং একইসঙ্গে অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে নদ-নদীগুলো রক্ষা করতে হবে। নদীর জায়গা অবশ্যই নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং বেশিরভাগ নদীর নাব্য যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে নদীদূষণ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবশ্যই আমরা নদ-নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারব। নাহলে শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ হয়তো একদিন ধূসর মরুভূমিতেই পরিণত হবে।
ফরিদপুর
