বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারীর অবদান কোনো অংশে কম নয়। আমাদের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার থাকবে, সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে নারীরা কি সত্যিই স্বাধীন? তারা কি মুক্তভাবে তাদের জীবনকে বিকশিত করতে পারছে? পারছে কি মুক্তভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্র বিচরণ করতে?
বাংলাদেশের নারীরা পারিবারিক পরিমণ্ডলে এবং সমাজজীবনে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, উপেক্ষিত ও নির্যাতিত। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে সমাজজীবনের প্রতিটি ধাপে নারীরা বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নারীকে প্রতিনিয়ত বহন করতে হচ্ছে নির্যাতন, নিপীড়ন ও মৃত্যু যন্ত্রণা। বারবার আঘাত আসছে নারীর জীবনের ওপর, শরীরের ওপর। এই সমস্ত আঘাত ও আঘাতের হুমকি থমকে দিচ্ছে নারীর জীবনকে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমরা দেখতে পাই নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের অসংখ্য মর্মস্পর্শী ঘটনা। এইসব নির্যাতনের ঘটনা সাময়িকভাবে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও পৌনঃপুনিকতার কারণে বিষয়টিকে সমাজের মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিতে শিখে গেছে। অথচ নির্যাতনের শিকার হওয়া একজন নারীর জন্য নির্যাতনের বিষয়টি মোটেও স্বাভাবিক নয়। সহিংসতার শিকার নারী জগত্ ও জীবনের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, হতাশাগ্রস্ত হয়ে জীবন পার করে। নির্যাতিত পরিবারটিতে নেমে আসে মানসিক বিপর্যয়। আমাদের সমাজে ঘরের ভেতর নারীরা যেমন নির্যাতনের শিকার, ঘরের বাইরেও নারীরা ততোধিক নিরাপত্তাহীন। প্রত্যেকটি মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো পরিবার, কিন্তু সেই পরিবারেই নারীর প্রতি সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্বামীর দ্বারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী।
কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাস্তাঘাটে এমনকি চলন্ত বাসে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। অ্যাসিড নিক্ষেপ, পাচার, ইভটিজিং নারীকে প্রতিনিয়তই এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়। সামাজিক অধঃপতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এদেশে এখন অহরহ ঘটছে নারী ও শিশু ধর্ষণ।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে বিভিন্ন আইন। বেসরকারি পর্যায়েও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এখন কথা হলো, নারীর পক্ষে এত আইন বা নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কেন বন্ধ হচ্ছে না নারীর প্রতি সহিংসতা। মনে রাখতে হবে, শুধু আইন প্রণয়ন করেই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না, এজন্য চাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। চাই নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ। নারীর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যেখানেই নারীর প্রতি অবিচার দেখা যাবে, সেখানেই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।
সর্বোপরি, নারীর প্রতি পূর্ণ সম্মানই পারে সর্বত্র নারীর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে। তাই, আসুন না সবাই মিলে আজই সমাজে নারীর মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করি। নারীর প্রতি সব ধরনের অবিচার রুখে দিয়ে নারীর জন্য তৈরি করি একটি বাসযোগ্য নিরাপদ পরিবেশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
