ঘটনা :১
আপা কিছুদিন আগে ফোন করে বলল, ভাগিনার নাকি ‘ভাল্লাগে না’ রোগ হয়েছে। তো আমি ওদের বাসায় গেলাম। আপা তো আমায় পেয়ে কান্নাই করে দিল। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ভাগিনাকে নিয়ে বের হলাম। উদ্দেশ্য আমার স্যার, নামকরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বার। তো স্যার সব শুনে ওকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কি কিছুই ভালো লাগে না?’
ও বলল, ‘লাগে তো।’
স্যার বলল, ‘তাহলে তো সব সমাধান হয়েই গেল, যা ভালো লাগে এখন থেকে তা-ই করবে।’
স্যারের কথা শেষ হওয়ার আগেই ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর স্যারের কাছে গিয়ে তার ‘শাহি গোঁফ’ ধরে একটা ঝাঁকি দিল। স্যারও হতভম্ব, আমিও হতভম্ব। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ‘স্যার, ভিজিটটা।’ স্যার গম্ভীরমুখে বলল, ‘লাগবে না, যাও।’ মনে মনে ভাবছিলাম এবার আর আমার পাসটা হবে না।
ঘটনা :২
ভাগিনার জন্মদিন, ভাবলাম খাওয়ার কিছু দেব। খেলনা উপহার দিলে সেটা প্রথম দিনেই খুলে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে ফেলে। তো চুইংগামের বড় একটা প্যাকেট নিয়ে গেলাম। ভাগিনা সেটা পেয়ে বেশ খুশি হয়ে গেল। তবু আমার কেন যেন ভয় লাগছিল। দেখলাম, সে সবাইকে চুইংগাম দিচ্ছিল। কিন্তু শর্ত একটাই তাকে সব স্টিকারগুলো ফেরত দিতে হবে। কয়েকদিন পরে আপা ফোন করে বলল, ‘রাব্বি, তোর ভাগিনা বাসার সব টিকটিকি ধরে বাক্সবন্দি করে রেখেছে।’ আমি আর কিছু বললাম না, এটা স্বাভাবিক। এর দুইদিন পরে আপা আবার ফোন দিয়ে জানাল, বাসার সব টিকটিকির গায়ে নাকি টম অ্যান্ড জেরির স্টিকার লাগিয়ে দিয়েছে আমার একমাত্র ভাগিনা। ব্যাপারটা শুনে মজা লাগল। আমি সেগুলো দেখার জন্য ওদের বাসায় হাজির হলাম। ভাগিনাকে দেখলাম কাচের বোতলে একটা লেজ ছাড়া টিকটিকি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে বেশ মাজাই পাচ্ছিলাম। আপা পাশের বাসা থেকে সাপ্লাই করা সেমাই পিঠা খেতে দিলেন। আমিও সব চেটেপুটে শেষ করে পানি খাচ্ছি এমন সময় ভাগিনা এসে বলল, ‘কেমন লাগল?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ ভালো। ‘
ভাগিনা বলল, ‘আমিও তাই ভেবেছিলাম। ‘
আমার কেন যেন একটু সন্দেহ হলো, ‘আমি বললাম কেনরে?’
সে বলল, ‘টিকটিকির লেজটা তোমার পিঠার মধ্যে দিয়েছিলাম। অনেক মজা লেগেছে তাই না?’
আমি তখন আর কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলাম না। মনে হচ্ছিল পেটের মধ্যে কিসে যেন কামড় দিচ্ছিল।
ঘটনা :৩
অনেক দিন পর আপার বাসায় গেলাম। বাসার গেইটে ছোট্ট মতো একটা ছেলে আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিল। উপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘প্রিয় রাব্বি’। বাহ, এ দেখি প্রেমপত্র। এ যুগেও কেউ প্রেমপত্র দেয়! তবু সাবধানতা অবলম্বন করলাম, কারণ ফেসবুকে সেই ফেইক আইডির দেওয়া ছ্যাঁকা এখনো ভুলতে পারিনি। আমি বললাম, ‘এটা কে দিয়েছে খোকা?’
ছেলেটা বলল, ‘মেহারি দিয়েছে। ‘
চেনাচেনা লাগল না, কিন্তু আপাদের পাশের ফ্লাটের মেয়েটার কথা মনে হলো আর কিছু না বলে চলে এলাম। আমার মনের তো উথালপাতাল অবস্থা। চিঠিটা সযত্নে পকেটে রেখে কোনো রকম হোস্টেলে গিয়েই ওটা নিয়ে বসে পড়লাম। চিঠির হাতের লেখা খুবই সুন্দর, তাই প্রমাণ করে এটা ফেইক নয়। চিঠিতে প্রথমেই লেখা, এই আধুনিক যুগে চিঠি দিচ্ছি কারণ আমি পুরাতন জিনিস ভালোবাসি আর সাথে আপনকেও। আপনিও মনে হয় পুরাতন জিনিস বেশি পছন্দ করেন, কারণ গত দেড় বছর ধরে ওই একজোড়া জুতাই পায়ে দিচ্ছেন (ওটা এখন অবসরে পাঠানো উচিত)। আপনার যদি কিছু বলার থাকে তো জানাবেন।
চিঠি শেষ করেই তাড়াতাড়ি নিউমার্কেট গিয়ে একজোড়া জুতা কিনলাম। পরের দিন নতুন জুতা পায়ে দিয়ে আপাদের বাসার গলিতে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ঘণ্টা দুই পরে আপাদের পাশের ফ্লাটের মেয়েটাকে আসতে দেখলাম। আমি বিশাল ভাব নিয়ে বললাম, ‘এক্সকিউজ মি, একটু কথা বলতে পারি? আসলে আমার পক্ষ থেকেও হ্যাঁ। আমিও আপনায় ভালোবাসি!’
মেয়েটার মুখে এক্সপ্রেশন দেখে মনে হলো সে এখনই একটা চড় বসিয়ে দেবে। কিন্তু কিছু না করে শুধু বলল, ‘দেখুন ভাইয়া যা বলার আব্বুকে বলবেন।’
ওই মেয়ের সাথেই আমার বিয়ের কথা চলছে, কারণ ব্যাপারটা আপার কান পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পরে বুঝেছি মেয়েটা চিঠি দেয়নি, আর তার নাম সাদিয়া, মেহারি না। তাহলে মেহারিটা কে? যে এত ভালোবেসে চিঠিটা দিল। ওই পিচ্চিকে ধরে জানতে পারলাম, মেহারি হচ্ছে মেহেদি হাসান রিক্ত। আমার এক মাত্র ভাগিনা...
বিক্রমপুর মেডিক্যাল কলেজ
