মৌ

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:০১

বইমেলায় গিয়ে মেলা শেষে কবি-লেখকগণের সাথে আড্ডা সেরে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। তাও আড্ডা হয়তো শেষ হতো না, যদি না মশক সম্প্রদায় রক্ত খাওয়ায় ইস্তেফা দিত! অর্থাত্ মশারা রক্ত খেয়ে পেট তো ঢোল বানিয়েছেই, কিন্তু জায়গার অভাবে অনেকের রক্ত ঠিকঠাক খেতেও পারেনি তারা। এটা যে মশক সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কমার একটা পূর্বাভাস, তা বোধহয় বলে দিতে হয় না! কবি-লেখকেরা হয়তো প্রতিজ্ঞা করেছিল, আজ মশাদের পেট না ভরিয়ে তারা বাসায় ফিরবে না!

হিরু গেটে এসে দেখল বাসার কুকুরটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ভাবল এমন নিশুতি রাতে হয়তো চোরও ঘুমিয়েই থাকবে। চুরি করবে না। বরং হালকা শীতে কাঁথা পেঁচিয়ে ঘুমানোটাকে উপভোগ করবে।

হিরুর তাও কপাল। তিন ঘণ্টার আড্ডায় এককাপ লিগার চা অন্তত জুটেছে তার। হোক তা পানসে, চায়ে চিনির অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু অন্তত পাঁচজন তো চা-ই পেল না! তারপর সুদীর্ঘ আড্ডা শেষে যখন বিলপর্ব এলো, তখন সকলেই মানে মানে পিছিয়ে এলো! শেষমেশ সেই চা না-খাওয়া পাঁচজনের একজনকেই জনা ত্রিশেক মানুষের চায়ের বিল পরিশোধ করতে হয়েছিল।

ফেরার পথে হিরু ভাবল, এখন বাসায় গিয়ে নিশ্চিত ঠাণ্ডা ভাত খেতে হবে। কিন্তু কিসের কী! হিরু বাসায় ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেই দেখল ভাত থেকে ধুম্র উড়ছে!

‘ভুল দেখছি না তো!’ হিরু ভাবল, ‘নাকি শীত হঠাত্ বেড়ে গেছে! ভাত থেকেও কুয়াশা উড়ছে!’

অবশ্য খাওয়ার সময় বাস্তবতা টের পেল সে। ধোঁয়াওঠা ভাত-তরকারিতে জিহ্বা পুড়ে গেল তার। এর আগে রাত করে বাসায় ফিরে এমন গরম ভাত সে কখনো খেয়েছে বলে তার মনে পড়ে না।

রুমে ফিরে দেখল চমত্কারভাবে বিছানাটা সাজানো। মশারিটাও সুন্দর করে টাঙানো। কে করল এসব?

 

২.

সাত সকালে বাসায় শোরগোল শুরু হয়ে গেল। শব্দের তীব্রতা হিরুর সকালের ঘুমকে বনবাসে পাঠাল।

‘কী হয়েছে মা?’ বেডে শুয়েই হিরু চিল্লিয়ে উঠল।

অমনি হিরুর বাবা-মা দুজনই এসে হাজির। ‘দেখ না বাবা, সাত সকালে মেয়েটা আবার কোথায় গেল?’

‘কোন মেয়ে?’

‘আরে, তোর আন্টি।’

‘আমার আন্টি তো অনেকেই। কার কথা বলছ?’

‘আরে! জামশেদের শ্যালিকা—মৌ!’

‘মৌ আন্টি আবার এই সাতসকালে কোত্থেকে এলেন?’

‘সকালে আসেনি। গতকাল বেড়াতে এসেছিল। জানিস এসেই আমাদের জন্য কতকিছু রান্না করেছে! তুই তো লেট করে এলি...। সে যাকগে, সকালে উঠে দেখি মেয়েটা নাই! একেবারে উধাও! কই যে গেল মেয়েটা...’

হিরুর ছোটকুর মৌ নামে একজন শ্যালিকা আছে। ছোটকুর শ্যালিকা হলে কী হবে—বেচারি হিরুর জন্য পাগল। অর্থাত্ সম্পর্কে হিরুর আন্টি হলেও, হিরুর বৌ হতে চায় মৌ। হিরুকে সে দামি মোবাইল ফোন গিফট করেছিল, আরও কতকিছুই না করেছে... তার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। হিরু ভাবল, ‘কাল রাতে তাহলে মেয়েটাই আমার জন্য গরমাগরম খাবার রেডি করে রেখেছিল! মশারি টাঙিয়ে রাখাটাও নিশ্চয় তারই কাজ!’ হিরু মনে মনে একটু পুলকিতই হলো।

‘তুই যা না বাবা...’ হিরুর মা বললেন।

‘কোথায় যাব? ছোটকুর শ্বশুরবাড়ি?’

‘না, মানে... একটু বাইরে গিয়ে খুঁজে দেখ না। কোথায় যে গেল মেয়েটা...। সকালে উঠে ওর পছন্দের পায়েস বানিয়ে রেখেছি...’

‘সত্যি!’ অন্য আরেকজনের কণ্ঠস্বর কানে এলো সবার। মৌ! সবাই অবাক হয়ে দেখল হিরুর খাটের অপর পার্শ্বে এতক্ষণ কম্বল মুড়ি গিয়ে শুয়ে ছিল সে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে সে বলল, ‘আম্মা, তাড়াতাড়ি পায়েস দিন। জিভে জল এসে গেল।’

‘মেয়েটার মাথা গেছে। আমি তোমার আম্মা নই। বেয়াইন।’

মৌ কম্বল ছেড়ে পুরোপুরি বেরিয়ে এলো। হিরুর বাবা-মা এই রুমে ঢোকার একটু আগেই ঘুম ভেঙেছে তার। প্রথমে বুঝতে পারেনি, পরে দেখল—হিরু তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে। মৌ বলল, ‘কেন! আপনারা তো আমার শ্বশুর-শাশুড়িই হন। আর হিরু আমার স্বামী! কাল আমরা বিয়ে করেছি!’

‘মানে!’ চিল্লিয়ে উঠল সবাই।

‘হিরুর সাথে আমার সব হয়ে গেছে!’

‘সব হয়ে গেছে মানে?’

‘দেখলেন না আজ রাতে আমরা দুজন একই খাটে ঘুমালাম!’

কারওর মুখে কোনো কথা নেই। সকলেই অপরিসীম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে।

মৌ ফের বলল, ‘চলেন আম্মা, আপনার হাতের মিষ্টি-মধুর পায়েস গলাধঃকরণ করি। স্বাধে কি আর লোকে বলে—শ্বশুর বাড়ি মধুর হাঁড়ি!’ হিরুর মাকে টানতে টানতে খাবার রুমের দিকে নিয়ে গেল সে। তাদের পিছু পিছু হিরুর বাবাও গেল।

৩.

এটা সত্যি যে মৌ হিরুকে চায়। হিরু তাকে বারবার ফিরিয়ে দিলেও, সে দমে যায়নি। এমনকি হিরুর সব ধরনের কথা মেনে নিতে রাজি আছে সে। প্রয়োজনে হিরুর সার্কেলের সকলের ‘ভাবি’ নয়, ‘চাচি’ ডাক শুনতেও রাজি সে। এমনকি নিজের বোনকে (তণুকে) ‘কাকি’ বলে ডাকতেও অমত নেই তার। দরকার পড়লে হিরুর (তণু) কাকির বাপকে (নিজের বাপকে) ‘আংকেল’ বলে ডাকবে সে। তবুও হিরুকে তার চাই!

হিরুর মা বলল, ‘পায়েসটা কেমন হয়েছে?’

‘খুব ভালো হয়েছে, শাশুড়ি আম্মা।’

‘তোমার আর কিছু লাগবে? আমি বাজারে যাচ্ছি, তাহলে তোমার জন্য নিয়ে আসব।’ হিরুর বাবা জানতে চাইল।

‘আমার কিছু লাগবে না, শ্বশুর আব্বা।’

হিরুর বাবা-মা দুজনই হতাশ। মেয়েটা সত্যিই পাগল হয়ে গেছে। কেউ কি তার দুলাভাইয়ের ভাই-ভাবিকে শ্বশুর-শাশুরি বলে ডাকে? দুলাভাইয়ের ভাইপোকে জামাই বানাতে চায়?

 

৪.

হিরু চুপ করে বসে আছে। তার ছোটকুর এই শ্যালিকাটা ভীষণ পাগলাটে। অবশ্য তার সে পাগলামোর সিংহভাগই হিরু কেন্দ্রিক। গতবার অনেক কষ্টে বাঁচা গেছে। এখন আবার এসে উত্পাত শুরু করে দিয়েছে।

হিরু ভাবছে, ছোটকুটা এখন এখানে থাকলে জমত বেশ। বেচারা! দশটা না পাঁচটা না, একটা মাত্র শ্যালিকা পেল। তাও আবার আপন ভাস্তের কাছে হারাতে হচ্ছে তাকে!

হিরু তার ছোটকুকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে ছোটকুর উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠস্বর, ‘কীরে, কতদূর এগোলো?’

হিরু বুঝতে পারল, মৌ এবার ভালো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। বোন-দুলাভাইকে হাত করে নিয়েছে। হয়তো বাবা-মাকেও!

হিরুও হেসে বলল, ‘বাসর রাতটা পাড় করে ফেললাম!’

ওপাশে ছোটকু মনে হয় খাবি খেলেন। সম্ভবত তাদের জানা চিত্রনাট্যে এমনটা ছিল না। তিনি কাতরস্বরে জানতে চাইলেন, ‘কেমনে পারলি তুই? অন্তত একটিবার তোর ছোটকু, আচ্ছা আমার কথা বাদ দে, তোর চাচি, আইমিন তণুর কথাও ভাবলি না...’

হিরু হেসে বলল, ‘তোমাদের কথা ভেবেই তো এগিয়েছি। তোমাদের সাথে সম্পর্কটা আরও পোক্ত হলো।’

‘এমনিতেই তো যথেষ্ট পোক্ত ছিল। ডাবল পোক্ত করার কী খুব দরকার ছিল...’ ছোটকু এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি।

হিরু বলল, ‘রাখছি ছোটকু। সে না যত্ন করে পায়েস বানিয়েছে আমার জন্য! ডাকছে।’

‘একা একাই পায়েস খাবি...?’

হিরু আর ছোটকুর বাকি কথা শুনতে গেল না। ফোনটা রেখে দিল।

 

৫.

সকালে ঘুম ভাঙতে খিদেটাও চেপেছে বেশ। হিরুও গিয়ে খাবার টেবিলে বসল।

হিরুকে দেখে তার মা যেন কলজেতে পানি পেল। বলল, ‘তুই বাবা একে একটু বোঝা!’

‘কী হয়েছে মা?’

‘এমন ভাব করছিস যেন কিছুই জানিস না!’

‘হ্যাঁ, জানি তো। রাতে আমি বাসায় ফেরার কিছুক্ষণ আগে আন্টির হঠাত্ খুব ক্ষুধা লাগে। তিনি উঠে মাইক্রোওভেনে খাবার গরম করে একপেট খেয়ে নেন।’

‘তারপর?’

‘বেশ মশায় কামড়াচ্ছিল। তিনি মশারি টাঙিয়ে শীতের রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েন।’

‘তারপর?’

‘ওওহো, বলতে তো ভুলেই গেছি—রাতে মৌ আন্টি ভুল করে আমার রুমেই ঘুমিয়ে পড়েন।’

‘তারপর?

‘তারপর আর কী... যা হওয়ার হয়ে গেছে!’

‘নাআআআ।’ এতক্ষণে মৌ চিল্লিয়ে উঠল।

‘কী হলো?’ হিরুর বাবা জানতে চাইলেন।

‘নাআআ, এ আমি মানি না।’ মৌ আবার বলল।

‘কী হয়েছে?’ হিরু জানতে চাইল।

‘আমি-আমি বাসায় যাব।’

‘একটু আগে তণু চাচির সাথে কথা হলো—তারা বলল, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি।’

‘কেন?’ হিরুর বাবা জানতে চাইল।

‘বিয়ে হলে অনেক খরচার ব্যাপার না? গিফট, আরও কতকিছু...। কোনো কিছুই তো লাগল না।’

‘নাআআ, এ আমি মানি না।’ মৌ সেই একই কথা বলে চলল।

হিরুর বাবা-মা এবার একটু নরম হলো। হিরুর মা বলল, ‘মেয়েটা যে তোর প্রতি এতটা পাগল, তা তো জানতাম না। যাক, সমাজ যাই বলুক না কেন, আমরা এটাকে সামলে নেব। তুমি চিন্তা করো না মা।’ বেয়াইনের প্রতি তার সম্বোধন পালটে গেল। বেয়াইন হয়ে গেছে ছেলের বউ!

মৌ এবার কাঁদতে লাগল।

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘কাঁদছেন কেন? লাল বেনারসি শাড়ি পাননি বলে? নাকি আত্মীয়-স্বজনদের গিফট মেলেনি বলে?’

মৌ এতক্ষণ বাদে একটু ধাতস্থ হয়েছে। সে বলল, ‘আমি এখনি বাসায় চলে যাচ্ছি। এ বাসায় আর কখনো আসব না।’

সে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল।

মৌ ভেবেছিল রাতে সে হিরুর বিছানায় ঘুমিয়ে থাকলে হিরু বাধ্য হয়ে তার জন্য নির্ধারিত স্থানে (গেস্টরুমে) গিয়ে ঘুমাবে। হিরু ঘুমিয়ে গেলে, সেও গিয়ে হিরুর পাশে ঘুমিয়ে পড়বে। সকালে যখন সবাই দেখবে—হিরু মৌয়ের পাশে ঘুমিয়ে আছে, সকলে হিরুকে ছিঃ ছিঃ করবে! বেশ জব্দ করা যাবে হিরুকে! বাংলা সিনেমায় এমন ঘটনা সে কতবার দেখেছে...! কিন্তু সকালে তার ঘুম ভাঙতে দেখে—উল্টো সে-ই হিরুর বিছানায় ঘুমিয়ে আছে! হিরুর পাশে! আর স্বয়ং হিরুই যখন তার মজা নেওয়ার বিয়ষটা নিয়ে উল্টা মজা নিতে আরম্ভ করল, ভীষণ লজ্জা পেল সে। শেষমেশ পালিয়ে বাঁচল।

 

৬.

‘বুদ্ধিটা কেমন ছিল?’ হিরু জানতে চাইল।

হিরুর বাবা-মা দুজনেরই মুখে হাসি। পাগল মেয়েটাকে সামলানো গেছে। লজ্জায় মেয়েটা আর এ মুখো হবে না।

তবে, হিরুর বাবাকে দেখে মনে হলো—তিনি কিছুটা কনফিউজড। ‘কীভাবে কী করলি বল তো?’ হিরুর বাবা জানতে চাইল।

ব্যাপারটা হিরুর মা ব্যাখ্যা করল, ‘বেশি কিছু না। কাল হিরুকে মোবাইলে মেয়েটির আসার খবর জানাতেই ও আমাকে বুদ্ধিটা দেয়। ওর কাছে একটা ক্লোরোফর্মের শিশি ছিল। রাতে মৌ যখন হিরুর রুমে ঘুমানোর ভান করে শুয়ে ছিল, তখন আমি সেই শিশি থেকে কয়েক ফোটা ক্লোরোফর্ম রুমালে ঢেলে নিয়ে ওর মুখে ধরি, ব্যস...’

‘কিন্তু হিরুকেও যে একই বিছানায় ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম...’ হিরুর বাবা এখনো দ্বিধান্বিত।

‘আর বলো না। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! আমাদের প্ল্যান ছিল—হিরু সকালে এসে মৌয়ের পাশে এসে ঘুমানোর ভান করবে। কিন্তু রাতে আমি যখন মৌয়ের নাকে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমালটা ধরি, হিরু তখন আমার পাশেই ছিল। ওর হঠাত্ হাঁচি পায়। শব্দ করলে মেয়েটা জেগে উঠতে পারে, এই ভেবে আমি তখন ভুলে ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমালটাই ওর মুখে চেপে ধরি! আর সাথে সাথে ও-ও অজ্ঞান হয়ে যায়। ওর অত বড় দেহটাকে তো আর আমি টেনে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারি না, তাই দুই অজ্ঞান ব্যক্তিকে পাশাপাশিই শুইয়ে রেখেছিলাম!’

‘ওওও। কিন্তু...’ হিরুর বাবা এখনো দ্বিধান্বিত।

‘কিন্তু কী?’ হিরুর মা জানতে চাইলেন।

‘মেয়েটা অনেক ভালো। অমন একটা মেয়েকে আমাদের হিরুর জন্য বউ করে আনলে মন্দ হতো না। শোনো, এক কাজ করলে কেমন হয়...’

হিরু বাসা থেকে বেরিয়ে এলো। মা-বাবার বাকি কথা শোনার তার আগ্রহ নেই। তার মতে—এমন অনেক কথা থাকে, যা শুনতে হয় না!