যান্ত্রিক কৃষির বিকল্প নেই

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৩৮

বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল সরবরাহ সহজলভ্য রাখতে কৃষি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকারের কৃষি ক্ষেত্রে আন্তরিকতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক বিতরণ, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, কৃষি গবেষণা ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষিক্ষেত্রে ভতুর্কি প্রদান ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গত বছর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় শত শত একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু সরকারের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার ফলে কৃষক আবারও আশার আলো খু্ঁজে পেতে শুরু করেছে। প্রতিবছর জাতীয় অর্থ বাজেটে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয় কৃষিক্ষেত্রে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সমস্যাগুলোকে খুঁজে বের করে তার উপযুক্ত সমাধান নিশ্চিত করলেই কৃষি বাজেট হবে সার্থক ও সফল। সরকারের কৃষিঋণ প্রদানে আন্তরিকতা থাকলেও মাঝে মাঝে কৃষকদের কৃষিঋণপ্রাপ্তিতে হয়রানির শিকার হতে হয়। এক্ষেত্রে কৃষি ব্যাংকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আরো কৃষকবান্ধব হতে হবে এবং সরাসরি মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরো প্রচারমুখী হতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের সেচ ব্যবস্থাপনা, হ্যাচারি, পোল্ট্রিশিল্প ও ডেইরিশিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিদ্যুত্ মিটারের পরিবর্তে বিকল্প কোনো কৃষকবান্ধব বিদ্যুত্ মিটারের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রতিবছর আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ থেকে বিশেষ করে মসলা জাতীয় ফসল (পিঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, এলাচি, দারুচিনি ইত্যাদি) আমদানি করা হয়। এর ফলে দেশের প্রচুর রাজস্ব খরচ হয়। কৃষকদের মসলা জাতীয় ফসল চাষের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। ফলে দেশেই উত্পাদিত হবে মসলা জাতীয় ফসল। এছাড়াও ফিসফিড, পোল্ট্রিফিড এবং ডেইরিফিডের কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ফসল মাঠ থেকে শহরে  এলে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সরকারি উদ্যোগে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ফসল, দুধ এবং ডিম ক্রয় করলে কৃষকরা পাবে ন্যায্যমূল্য এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা থাকবে না। কৃষির আধুনিকায়নে যান্ত্রিক কৃষির বিকল্প নেই। সরকারি সহযোগিতায় পরিচালিত ই-ভিলেজ প্রকল্প কৃষির ডিজিটালাইজেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কৃষি যন্ত্রপাতির উপর সরকারি ও বেসরকারি  অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে। কৃষি উত্পাদনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াতে উন্নত দেশগুলোর মতো শস্য বীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি। শস্য বীমা চালু হলে দেশে কৃষি উত্পাদনের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাবে আর্থিক সহযোগিতা। প্রতিবছর কৃষি উন্নয়নের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। ভর্তুকি শব্দটির পরিবর্তে বিনিয়োগ শব্দটি ব্যবহার করলে কৃষকের আত্মমর্যাদা ও সম্মান আরো বৃদ্ধি পাবে। ভেটেরিনারি চিকিত্সার জন্য ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকগুলোকে আরো প্রচারমুখী হতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে তথ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি  ইউনিয়ন পরিষদে ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যসেবা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব তথ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আরো কৃষকবান্ধব হতে হবে। কৃষি তথ্যসেবাভিত্তিক মোবাইল অ্যাপস এবং কৃষি কল সেন্টারগুলোকে আরও আধুনিকায়ন এবং প্রচারমুখী হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে আরো কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান ও টকশো প্রচার করতে হবে। সংবাদপত্রে কৃষি বিভাগ খুলতে হবে এবং কৃষকের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলোকে আরো প্রচার করতে হবে। অবশেষে বলতে চাই—কৃষকের উন্নতি হলে কৃষির উন্নতি হবে এবং কৃষির উন্নতির মাধ্যমেই দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে।

n লেখক: শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়