একটি সাদা রঙের গ্যাস বেলুন আকাশে উড়িয়ে দেয়া হলো। তাতে ভিডিও ক্যামেরা বাঁধা। সঙ্গে টিভি স্ক্রিন। নিচে থেকে ভিডিওতে কথা বললে উপরের ভাসন্ত টিভি স্ক্রিনে ফুটেজ দেখা যাবে। উড়ন্ত টিভি স্ক্রিনে হঠাত্ কিছু নিষ্পাপ বাচ্চার চেহারা ভেসে উঠলো। খুব নির্লিপ্তভাবে তাদের কেউ বলছে, ‘আমার সামনেই মেলেটারিরা আমার বাবাকে হত্যা করেছে, মাকে রেপ করেছে।’ কেউ বলছে, ‘আমি কিছু শিশুকে নিজের চোখে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করতে দেখেছি।’ আবার কেউ বলছে, ‘আমাদের জন্য কি সামান্য একটু জায়গা হবে না? আমাদেরকে পৃথিবীর বুকে সামান্য একটুকরো জমি দাও!’
ভাসতে থাকা সাদা বেলুনে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের উড়ে বেড়ানো কথাগুলো যেন নিমিষেই আকাশ-বাতাসকে ভারি করে তুললো। আর ব্র্যাকের একদল কর্মীর তৈরি করা ডকুমেন্টারি ভিডিও চিত্রটি বুকের মধ্যে হাহাকার জাগিয়ে দিলো।
মিডিয়ার কল্যাণে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বই কমবেশি জানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সেদেশের সরকার কী আচরণ করেছে! বর্তমান বিশ্বের সব থেকে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অবহেলিত দশা দেখে ‘গণহত্যা, নির্যাতন, নির্মমতা, অত্যাচার, লুণ্ঠন, অন্যায়, অবিচার’ ইত্যাদি... সব নেতিবাচক শব্দগুলোই যেন মুখ লুকাবে!
কিন্তু রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এমন অবিচার কেন? এই প্রশ্নে মিয়ানমার সরকারের সংক্ষিপ্ত জবাব হতে পারে, ‘ওরা আমাদের কেউ না’। এই কথার সত্যতা খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
বর্মি সামরিক জান্তা সরকার ১৯৭০ সালের পর থেকে দাবি করে আসছে মিয়ানমারে রোহাং বা রোহিঙ্গা বলতে কিছু নেই, রোহিঙ্গারা এদেশের নাগরিক নয়। এরপর থেকেই কয়েক বছর পরপরই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর দিয়ে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালায় মিয়ানমারের সরকার, সেনাবাহিনী, স্থানীয় মগ, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মিলে। আর প্রতিবারই প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা ভিড় জমায় বাংলাদেশ সীমান্তে।
২০১৬ সালে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরুর পরও মিয়ানমার সরকার একই কথা বলেছে। ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক এক ভাষণে রোহিঙ্গাদেরকে অস্বীকার করে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা কোনোকালেই আমাদের কেউ নয়, তাদের বিরুদ্ধে এক হন’!
কিন্তু মিন অং হ্লাইয়াং-এর এক উত্তরসূরি অনেক আগেই সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলে রেখেছেন! সেটি হয়তো তার জানা নেই। নাকি না জানার ভান করেছেন। ইতিহাস ঘাটলে আমরা কিন্তু ভিন্ন কথা জানতে পারি। ১৯৬১ সালের ৪ জুলাই। সে সময়ের বার্মার ভাইস চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং জি তার আনুষ্ঠানিক ভাষণে বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা আরাকানেরই শান্তিপ্রিয় নাগরিক। বার্মা সরকারের তরফ থেকে শুধুমাত্র ভুল বুঝাবুঝির কারণে রোহিঙ্গাদের প্রতি বহু অন্যায় করা হয়েছে ; আজ এ ভুল বুঝাবুঝির অবসানের মাধ্যমে সকল সমস্যা দূরীভূত হোক।’ জনাব অং জি শুধু এটুকু বলেই থেমে যাননি। তিনি মানবতাবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে সেদিন আরো বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব সীমান্তে একই জাতি সীমান্তের দু্ই পারে বাস করে। এজন্যে কোনো নাগরিকের জাতীয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া উচিত নয়।’
এগুলো আমার মনগড়া কথা নয়। এই কথাগুলোকে কোড করে সে সময় ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয়েছিলো। ইতিহাসের সেসব দলিল কালের সাক্ষী হয়ে আছে। জনাব অং জি-এর উক্তিকে আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষকেরা রোহিঙ্গাদের আরাকানীয় ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আবদুল করিম ‘রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস’ বইটি লিখেছেন। অধ্যাপক এন. এম হাবিবউল্লাহ রোহিঙ্গা বিষয়ের উপর গবেষণার কাজ করেছেন। ‘রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ। তাদের স্ব স্ব গ্রন্থে একই বিষয়কে প্রমাণিত করেছেন।
অধ্যাপক এন. এম হাবিবউল্লাহ বলেছেন, ‘প্রাচীন আরাকানী ইতিহাসেই বর্ণিত হয়েছে, মাহাতোইং ত্সান্দ্যার শাসনামলে (৭৮৮-৮১০ খ্রি.) উপকূলীয় দ্বীপ রামবির সামান্য দূরে বেশ কয়েকটি আরবীয় জাহাজ ডুবে যায়; এসময় মুসলিম নাবিকেরা কোনোভাবে রক্ষা পান এবং সাঁতরে তীরে ওঠেন। আরাকানি ইতিহাসে তাদেরকে বলা হয়েছে কুলা অর্থাত্ বিদেশি। তাদেরকে নিয়ে যখন রাজার সামনে হাজির করা হলো, তিনি পরে তাদের জন্য একখণ্ড জমি বরাদ্দ দেন এবং তাদেরকে সেখানে বসতি স্থাপন করতে দেয়া হয়। এটাই হলো আরাকানে মুসলিম বসতির প্রথম নিদর্শন।
অর্থাত্ বর্তমান রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসতি হাজার বছরেরও পুরাতন। ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত একথা বার্মা সরকারও স্বীকার করেছে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, যে মগ সম্প্রদায়ের লোকেরা আজ রোহিঙ্গাদের হত্যা করতে মেতেছে, তারাই রোহিঙ্গাদের সব থেকে আপন ছিলো। প্রতিবেশী হিসেবে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মগদের বেশি সখ্যতা ছিলো। মগরা বার্মা সরকারের থেকে রোহিঙ্গাদেরকে বেশি বিশ্বাস করতো। এমনকি ১৯৫৭’র জাতীয় নির্বাচনে সাতজন রোহিঙ্গা পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়। একটি জাতিকে ভূতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে এর থেকে বেশি কিছু লাগে না। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এখনো তাদের স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়েই পড়ে আছে। তারা ধর্মের ক্ষীণদৃষ্টি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক স্বার্থের কাছে মানবতাবাদকে জলাঞ্জলি দিয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলির রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে এক রোহিঙ্গা নারী তাকে বলেছেন, ‘দয়া করে আমাদের অধিকার নিশ্চিত না করে রাখাইনে পাঠাবেন না, দরকার হয় গুলি করে মেরে ফেলুন!’ এই নারীর কথা থেকেই খুব সহজে অনুমান করা যায় নাফ নদীর ওই পাড়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কী নির্মমতা, নিষ্ঠুরতাই না চালানো হয়েছে! তাদের কাছে এখন নাফ নদী পুলসিরাতের মত!
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের ধৈর্যের পরীক্ষা চলছে। এই ধৈর্যের পরীক্ষা যে কতদিন চলতে পারে তাও কারো আন্দাজ নেই।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি সরকার দলীয় সাংসদ মোহম্মদ নাসিম সংসদে রোহিঙ্গা ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সংসদে আরো বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান জানান যেন সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়। তার মানে জাতীয় নীতিনির্ধারকরাও এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেননি। সিদ্ধান্ত হলেও সেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে। তবে বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা সঠিক সময়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিকতা, উদারনীতির পরিচয় দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছে তা যেন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এক নিমিষেই ছাইয়ে পরিণত না হয়ে যায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের জনগণ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছেন। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের কারণে ভৌগোলিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ক্ষতি নিশ্চিত জেনেও মানুষ নীরবে সমর্থন দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কেউই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিরোধিতা করেনি। বরং সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। হ্যাঁ, সমস্যা সমাধানের জন্য গঠনমূলক আলোচনা অনেকেই করছেন।
সাময়িক ক্ষতি হলেও এতোগুলো মানুষের জীবনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনুকূলে না আসলে রোহিঙ্গাদেরকে আবারো নরকে ঠেলে দেয়া উচিত হবে না। এই সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রয়োজন বাংলাদেশ সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ। মিয়ানমারকেও তাদের ভুল বুঝে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জেনারেল অং জি-এর মত আমরা আবারো মিয়ানমারের কোনো একজন দায়িত্বশীল নেতার কণ্ঠে শুনতে চাই: ‘পৃথিবীর সব সীমান্তে একই জাতি, সীমান্তের দু্ই পাড়ে বাস করে। এজন্যে কোনো নাগরিকের জাতীয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া উচিত নয়।’
n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
