‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৭

বর্তমান তরুণ সমাজ নানাভাবে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে। পড়াশুনা আর জ্ঞানচর্চা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে তারা। আর সাহিত্য চর্চার কথা তো ভাবাই যায় না। তরুণরা যে পড়ে না, তা বলা যায় না। কারণ তারা এখন চেহারার বই (ফেইসবুক) পড়া নিয়েই অনেক বেশি ব্যস্ত। সাহিত্য চর্চার সময়টা নেই তাদের, আর সেটার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

 খাবার যেমন ক্ষুধাকে নিবারণ করে তেমনি বই চিত্তের ক্ষুধাকে নিবারণ করে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বইয়ের ভূমিকা ব্যাপক। কিন্তু এখনকার তরুণরা বই আর লাইব্রেরির প্রভাব থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। ফলে চারদিকে মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। সমাজের প্রতি দায়িত্বহীনতা, মাদকের ছোবল, ইভটিজিং এর মত ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। এ থেকে উত্তরণে বই হতে পারে দারুণ সমাধান।  ক্যাম্পাস লাইফে বই পড়া তেমন হয়ে উঠে না। ফলে এক বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে আমরা দূরে অবস্থান করি। যারা বই কিনে বা সংগ্রহ করে পড়ার সময় পায় না তাদের জন্যে ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক একটি সংগঠন কাজ করে  যাচ্ছে নিরলসভাবে। সংগঠনের নাম ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’।

‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’কে একটি ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারও বলা যায়। বইপ্রেমীরা সেখান থেকে বিনামূল্যে ও বিনাশর্তে বই নিয়ে পড়তে পারেন। তাদেরকে কোনো জামানত দেওয়া লাগে না, দিতে হয় না কোনো চাঁদাও, নিতে হয় না কোনো সদস্য পদও। তার উপর বই পড়তে নিলে ফেরত দেওয়ার তারিখও পাঠক নিজেই ঠিক করবেন। সংগঠন আপনাকে কখনোই কোনো সময় বেঁধে দিবে না।

বইয়ের ফেরিওয়ালার উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সজল কুমার। প্রথম বর্ষে যখন ভর্তি হন তখন থেকেই হাতে বই খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতেন সজল।

মূলত তরুণ সমাজের মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি এবং নৈতিক অধঃপতন দেখেই বই পড়ানোর চিন্তা মাথায় আসে তার। কিছু নিজের বই এবং কিছু সহপাঠীদের থেকে নিয়ে ধার দিতে শুরু করেন সবাইকে। ধীরে ধীরে এই কার্যক্রম অনেক সাড়া ফেলে তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে। অল্পদিনের মধ্যেই এর পরিধি অনেক বেড়ে যায়। এর কার্যক্রম ক্রমবর্ধনশীল। ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ এর কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হলেও বর্তমানে এর কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও পরিচালিত হচ্ছে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফেসবুক গ্রুপের সদস্য প্রায় ১৫ হাজার। মূলত এই সংগঠনে ফেইসবুক  গ্রুপ-এ বইয়ের পোস্ট দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকার জন্য। গত শীতকালীন ছুটিতে ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় বই নিয়েছে প্রায় ২৫৬ জন ব্যক্তি। এর পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই সংগঠনের কার্যক্রম চিত্র! ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’-এর কার্যক্রম মূলত অনলাইন ভিত্তিক। এছাড়াও নতুন করে আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রম।

এর মধ্যে বিভিন্ন বই ও সাহিত্যের উপর থাকে আলোচনা। তাছাড়া বিভিন্ন লেখকদের জন্ম বা মৃত্যু উপলক্ষে আয়োজন করা হয় পাঠচক্র, সাহিত্য আড্ডা ইত্যাদি। ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ থেকে সর্বশেষ শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ৮১তম মৃত্যু দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল  আলোচনা সভা। যার বিষয় নির্ধারণ করা হয় ‘নৈতিক সংকটের কালে শরত্ সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা’ যার আলোচক ছিলেন জনাব ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য।  ‘বইয়ের ফেরিওয়ালার’  একটা বাত্সরিক প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকে তা হলো ‘বইপড়া প্রতিযোগিতা’? সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

সম্প্রতি খোলা হয়েছে ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ এর একটি ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে ভিডিও আছে প্রায় ২০০টিরও বেশি। বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভিডিও, লেখকদের জীবনী ও সাহিত্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নিয়ে পরিপূর্ণ চ্যানেলটি। বর্তমানে শুধু বইয়ের ফেরিওয়ালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বই আছে প্রায় ৫০০টি। তবে এত অল্প পরিমাণ বই দিয়ে এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। অনেকেই আবার এক বই একাধিকবার চায়, ফলে তাদের বই দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই সাহিত্যপ্রেমী এবং বই পড়ুয়াদের কাছে বইয়ের ফেরিওয়ালার আবেদন ‘পুরনো বই ধূলাবালিতে ফেলে না রেখে আমাদের দিন, আমরা পৌঁছে দেব পাঠকদের কাছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা এর আশপাশের এলাকা থেকে ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ এর সঙ্গে ফেইসবুকে যুক্ত হতে পারেন এই ঠিকানায়: বইয়ের ফেরিওয়ালা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং অন্যান্য অঞ্চলের থেকে নিকটস্থ জোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে সাহিত্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারেন। 

লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়