শেয়ারবাজারে স্বল্প মূলধনী ও বিতর্কিত কোম্পানির শেয়ার কিনে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডিএসই সতর্ক করার পরও এসব কোম্পানির শেয়ার কেনেন অনেকে। এখন এমন ৩০টি স্বল্পমূলধনী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। দুর্বল এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারের তালিকাচ্যুত করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে সুপারিশ করা হবে।
সাধারণত, দুর্বল কোম্পানির মার্কেট শেয়ার অনেক কম। তাই এসব কোম্পানির দাম উঠানামা করানো বা কারসাজি করা ভাল শেয়ারের চেয়ে তুলনামূলক সহজ। তাই কারসাজিকারীরা এসব শেয়ারকে বেছে নেয়। আবার এসব কোম্পানির মালিকপক্ষও শেয়ারবাজার থেকে কৌশলে টাকা তুলে নিতে শেয়ারবাজারে আসে। তারা যখন বাজারে প্রবেশ করে তখন চমকপ্রদ অনেক ঘোষণা দেন। পরে দেখা যায়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে গেছে। এমনকি কয়েকবছর পরেই কোম্পানির মূল পণ্য উত্পাদনও বন্ধ হয়ে যায়। দুর্বল এসব কোম্পানি বছরের পর বছর কোনো লভ্যাংশ দেয় না। কিন্তু হঠাত্ করে শেয়ারের দাম বাড়ে। কয়েকদিন পর আবার বড় দরপতন হয়।
জানা গেছে, কারসাজিকারীরা দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কোম্পানির বেশিরভাগই জেড ক্যাটাগরির। ডিএসই বিভিন্ন রকম সতর্কবার্তার পরও দুর্বল কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও দাম বেড়ে যায়। আর তুলনামূলক কম সচেতন বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, তালিকাচ্যুত করার জন্য ১৫টি কোম্পানির ব্যাপারে বিএসইসির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ডিএসইসি। এরমধ্যে ৪টি কোম্পানির ব্যাপারে অনুমোদন পাওয়া গেছে। বাকি ১৫টির বিষয়েও শিগগিরই অনুমোদন চাওয়া হবে। এজন্য প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করবে ডিএসইসি। পরিদর্শনে যেসব প্রতিষ্ঠানের উত্পাদন দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ, সেগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। আর যেগুলো চালুর সম্ভাবনা রয়েছে, সে সব ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার) মার্কেটে পাঠানো হবে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ডিএসই’র এ সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। এতে দুর্বল এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি বলেন, এখন তালিকা থেকে বাদ দিলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং না করলেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি বলেন, অন্য দেশে এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানি অবসায়ন পদ্ধতি থাকলেও আমাদের দেশে নেই। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোক্তা ও ম্যানেজমেন্টকে আলাদা করার জন্য শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
আলোচনার মাধ্যমে তালিকচ্যুত করলে যাদের হাতে শেয়ার রয়েছে তারা কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। এটি সম্ভব না হলে দেউলিয়া আইনের মাধ্যমে ওই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তালিকাচ্যুত করা বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, আমরা তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সুশাসন ও স্বচ্ছতা আনার ব্যাপারে চেষ্টা করছি। সে কারণে বোর্ডে কয়েকটি দুর্বল কোম্পানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিএসই যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সেগুলো হল— প্রকৌশল খাতের কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ, খাদ্য খাতের কোম্পানি মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, বস্ত্র খাতের কোম্পানি দুলামিয়া কটন, ইমাম বাটন এবং বেক্সিমকো সিনথেটিক, এম কন্ডেন্সড মিল্ক, সমতা লেদার, শ্যামপুর সুগার, জিল বাংলা সুগার। এছাড়া বিডি ওয়েল্ডিং, জুট স্পিনার্স, সাভার রিফ্যাক্টরিজ, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, সুরিদ ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি অটোকারস, এমারেল্ড ওয়েল, বাংলাদেশ সার্ভিস, বিচ হ্যাচারি, ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং, হক্কানি পাল্প, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মিথুন নিটিং, সোনারগাও টেক্সটাইল, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, তাল্লু স্পিনিং, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, মুন্নু সিরামক, মুন্নু জুট স্টাফলার, সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইল এবং তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইং।
জানা গেছে, সামপ্রতিক সময়ে ৩০টি দুর্বল কোম্পানি পরিদর্শনের তালিকা করেছিল ডিএসই। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসইসির কাছে প্রাথমিকভাবে ১৫টি কোম্পানির তালিকা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৫টির অনুমোদন মিলেছে। এর মধ্যে একটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বাকি ৪টি কোম্পানির তালিকাচ্যুত করার ব্যাপারে সম্প্রতি ডিএসইর বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এগুলো হলো— মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা কন্ডেন্সড মিল্ক, ইমাম বাটন ও সাভার রিফ্যাক্টরিজ। দীর্ঘদিন থেকে এসব কোম্পানি নানা অনিয়ম করে যাচ্ছিল। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়াসহ আর্থিক খাতে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্বল মৌলভিত্তি ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের। বিভিন্ন সময়ে একটি চক্র এসব শেয়ার নিয়ে কারসাজি করেছে। এ কারণে কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে এ কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৫টি কোম্পানি বর্তমান কমিশনের আমলে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ৩০টি স্বল্পমূলধনী কোম্পানিতে বিভিন্ন ব্যাংকের এক হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। ফলে শেয়ারবাজার বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তির পাশাপাশি মুদ্রাবাজারেও সংকট সৃষ্টি করছে এসব প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে শেয়ারবাজার থেকে গত ১৯ বছরে তালিকাচ্যুত হয়েছে ৩৯ কোম্পানি। এসব কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল।
