বইমেলা আর বালি-ঘড়ি

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:২১

বইমেলায় ঢুকলেই বেশ কিছু কথা আমাকে কষ্ট দিতে থাকে। স্টলের হিসেবে দেশে প্রকাশকের সংখ্যা প্রায় পাঁচশো ছাড়িয়ে। কিন্তু পাঠক মাত্রই জানেন পাঠযোগ্য বা ক্রয়যোগ্য বই কখনোই পাঁচশো ছাড়ায় কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ আছে। এটি যে কেবল প্রকাশকদের ব্যর্থতা তা মোটেই নয়। এর পেছনে অনেকগুলো বাস্তব কারণও আছে।

আমাদের সামগ্রিক পাঠাভ্যাসকে দোষ দেওয়া খুব সহজ আর অনেকেই সেটাকে ভালো বই বের না হবার কারণ বলে মনে করেন। অনেকেই ভুলে যান এটা অনেকটা প্রবাদের মুরগি আর ডিমের প্রথম আত্মপ্রকাশ করার ঘটনার মতো। ভালো বই বের হোক বা না হোক, সম্ভাব্য পাঠকের সংখ্যা কিন্তু থেমে থাকছে না। এদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটিরও  ওপর। অনেকে মনে করেন বই পড়ার অভ্যাসের বিপরীতে প্রধানত প্রযুক্তি, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা আর শিক্ষা পদ্ধতি মূল অন্তরায় হয়ে উঠেছে। বিষয়গুলো রাতারাতি পাল্টে যাবে এমনটা কেউ ভাবেন না, তবে এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে দেওয়াটা জাতীয়ভাবে আত্মহত্যার সামিল। যেগুলো স্বল্পমেয়াদে করা সম্ভব সেগুলো নিয়েও আমাদের তেমন একটা মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

প্রতি বছরই বইমেলায় কিছু না কিছু উন্নতি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অতীত থেকে সব সময় শিক্ষা নেওয়া হয় বলে মনে হয় না। এখনও বইমেলায় স্টল খুঁজে বের করা অনেকটা মার্কো পোলোর চীন দেশ খুঁজে বের করার মতোই কষ্টসাধ্য। মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত একটি প্রামাণ্য ম্যাপ থাকা সত্ত্বেও দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত করে রাখার বদলে তারা এটিকে সোলায়মান বাদশাহর গুপ্তধনের ম্যাপের মতোই আগলে রাখতে পছন্দ করেন।

স্টল যদিও পূর্বপুরুষের আশীর্বাদে কেউ খুঁজে পেয়েও যান, নতুন কোনো বই বের হলো বা এর আগে কোনো ভালো বই বের হয়েছে কিনা এ বিষয়টিতে প্রকাশকরা তেমন মনোযোগী বলে কারো মনে হবে না। ভাবটি অনেকটা এ রকম, তারা কষ্ট করে এখানে স্টল দিয়েছেন সেটা নিয়েই পাঠকদের আসলে সৃষ্টিকর্তার কাছে শোকরানা আদায় করা উচিত। আর স্টলে কাজ করার জন্য যাদেরকে সাময়িকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে তারা ক্রেতাদের প্রয়োজনের বদলে জায়গাটিকে গল্প-গুজবের  মহাস্থান বলেই মনে করেন। অবশ্য এদেরকে বিপণনের প্রাথমিক প্রশিক্ষণও বেশির ভাগ প্রকাশক দেন বলে মনে হয় না।

আর এর পর আর্কিমিডিসের ইউরেকা ক্ষণের মতো কেউ যদি বইয়ের সন্ধান পেয়েও যান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বইয়ের মান, বিষয় আর মুদ্রণ দেখে চোখে জল আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে। নন-ফিকশন বইয়ের ক্ষেত্রে এটি ভয়ানকভাবে চোখে পড়ে। শুনেছি সারা বিশ্বে প্রতি বছর অন্তত বাইশ লাখ নতুন বই বের হয়ে থাকে এবং এর মধ্যে সিংহভাগই নন-ফিকশন। আমাদের পঠন-পাঠন আর চিন্তা-মননের ক্ষেত্রে যে আমরা আসলেই মফস্বল থেকে বের হতে পারিনি সেটি অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে সত্য।

প্রথা অনুসারে নিজের এ বছর প্রকাশিত বইয়ের কথা বলেই শেষ করি। এ বছর তাম্রলিপি (পাভিরিয়ন ১৪) থেকে আমার দ্বিতীয় কবিতার বই “বালি-ঘড়ি উল্টে যেতে থাকে” প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তি আর জাতীয় জীবন– সময় যে কারো জন্যে বসে নেই এটি আমরা সব সময় মনে রাখি না। প্রাপ্তি আর ক্ষমতাকে আমরা চিরস্থায়ী বলে ভাবি। আর ভুলে যাই উল্টে যাওয়াই বালি-ঘড়ির নিয়তি।