বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে শিক্ষিত নারী-পুরুষ, শূন্য থেকে লাখপতি অনেকেই

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৫

জাকারিয়া হোসেন। শিক্ষিত যুবক। শিক্ষাজীবন শেষে দীর্ঘদিন চেষ্টা তদবির করেও সরকারি চাকরি জোটাতে পারেননি। এজন্য অনেক ভৎসনাত শোনেন। একপর্যায়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন উচ্চ শিক্ষিত এই যুবক। তবে এসব এখন অনেক পুরনো কথা। কারণ বর্তমানে জাকারিয়া একজন সফল খামারি। তিনি স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জনের পরামর্শে অভাব ও বেকারত্ব ঘুচাতে জীবনযুদ্ধে বেঁছে নিয়েছেন দেশি মুরগী পালনকে। এজন্য যুক্ত হন ‘স্বপ্ন ছোঁয়ার সিড়ি’ নামের একটি খামার সংঘে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের ধড়মোকাম গ্রামস্থ বসতবাড়িতে গড়ে তুলেন ক্ষুদ্র পরিসরে বাণিজ্যিক দেশি মুরগীর খামার। এমনকি অল্পদিনের মধ্যে সফলতাও আসতে শুরু করে তার খামারে। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তার পরিবারেও আসে আর্থিক সচ্ছলতা। তাই মাত্র পঞ্চাশটি মুরগী নিয়ে শুরু করা খামারটিতে বর্তমানে আট শতাধিক দেশি মুরগী রয়েছে। বিগত চার বছরের ব্যবধানে ব্যবসার পরিধি বাড়ায় শূন্য থেকে লাখপতি বনে গেছেন যুবক জাকারিয়া।

কেবল জাকারিয়াই নয়, তার মতো এই উপজেলার প্রায় তিনশতাধিক শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী ভেটেরিনারি সার্জনের নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেশি মুরগীর (অরগানিক) খামার গড়ে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

আরো পড়ুন: বিয়ের উপহার হিসেবে ভোট চাইলেন বরের বাবা

এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব খামারের সঙ্গে  যুক্ত থেকে আরও পাঁচ হাজারেরও অধিক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরেজমিনে একাধিক খামার পরিদর্শনকালে কথা হয় সুর্বণা খাতুন নামের এক নারী খামারির সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘স্যারের পরামর্শে দেশি মুরগীর খামার করে দিনের নাগাল পেয়েছি। পাশাপাশি হতাশাগ্রস্ত বেকার জীবন থেকে কর্ম পেয়েছি।’

আব্দুস সালাম নামের আরেক খামারি বলেন, ‘শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দেই। কিন্তু চাকরি নামক সোনার হরিণ পাইনি। এতে হতাশ হয়ে পড়ি। বোঝা হয়ে যাই পরিবারের। প্রতিনিয়তই নানা ভৎসনাত শুনে বিপদে পা বাড়াই। হাতে তুলে নেই মাদক। কিন্তু একদিন হঠাৎ স্যারের সঙ্গে দেখা হয়। পরে তার পরামর্শে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসি। বসতবাড়িতে একটি দেশি মুরগীর খামার গড়ে তুলি। খুবই অল্পদিনের মধ্যে খামারটি লাভজনক হয়ে উঠে। এমনকি প্রতিমাসে এই খামার থেকে অর্ধলাখ টাকা আয় করছি।’

অন্যদিকে এই জাতের মুরগীর সংরক্ষণ ও বিস্তার ঘটলে দেশে নিরাপদ ও প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণ, আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আরো পড়ুন: কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর অভিযোগ

স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্র জানায়, বিগত ২০১৫ সালে পৌরসভাসহ এই উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেশি মুরগীর খামারের কার্যক্রম শুরু হয়। এই জাতের মুরগীর (অরগানিক) খামারের উদ্যোক্তা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. রায়হান। তার সার্বিক সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এখানে গড়ে উঠে প্রায় তিন শতাধিক খামার। তাদের নিয়ে তিনি গঠন করেন ‘স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি’ নামের একটি সংগঠন। আর এই সংগঠনের মাধ্যমে চাকরি না পাওয়া শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশি মুরগীর খামার গড়তে উদ্বুদ্ধ করছেন। ফলে সময়ের ব্যবধানে এ ধরণের খামার বাড়ছে।

সূত্রটি আরও জানায়, এই উপজেলায় মোট খামারি রয়েছেন ৩৫০জন। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা ১০০জন। আর পুরুষ উদ্যোক্তা রয়েছেন ২৫০জন। এরা সবাই শিক্ষিত নারী-পুরুষ। ক্ষুদ্র ও বড় পরিসরে দেশি মুরগীর খামার করে সবাই স্বাবলম্বী হয়েছেন। পরিবার ও সংসারে এনেছেন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। এই ভেটেরিনারি সার্জন নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গ্রামের হতাশাগ্রস্ত বেকার যুবক-যুবতীদের সরকারি সব সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকেও সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে এই ধরণের খামার গড়তে উদ্বুদ্ধ করছেন বলে সূত্রটি জানায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা পানিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারী সার্জন ডা. মো. রায়হান জানান, এই সেক্টরটি সম্ভাবনাময়। স্বল্প বিনিয়োগে চাকরির বিকল্প কর্মসংস্থানের নতুন খাত হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

পাশাপাশি ‘স্বপ্ন ছোঁয়ার সিঁড়ি’ সংঘের সামাজিক ইতিবাচক কার্যক্রমের মাধ্যমে যুব সমাজকে মাদক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানির মতো সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে তাদের বিরত রেখে কর্মমুখী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী সেখ বলেন, ভেটেরিনারি সার্জন রায়হান দক্ষ একজন কর্মকর্তা। তার বাণিজ্যিক ভিত্তিক দেশি মুরগির খামার মডেল হিসেবে যেন সারাদেশে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে এজন্য সবধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানান তিনি।

বগুড়া জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকতা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তার নিজস্ব চিন্তা চেতনা ও সহযোগিতায় গড়ে উঠা বাণিজ্যিক দেশি মুরগির খামার ইতিমধ্যে লাভজনক হিসেবে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। তাই তার এসব খামার মডেল হিসেবে সারাদেশে চালু করার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে সুপারিশ পাঠানো হবে।’

ইত্তেফাক/বিএএফ