বেশ কয়েকদিন আগে দেশটিতে থেকে ঘুরে এসেছেন বাংলাদেশি নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। দেশটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশটির মানুষগুলো অনর্গল ইংরেজি বলতে পারে। সেখানকার সবকিছুতেই ইংরেজি ভাষার ব্যবহার। এছাড়া তাদের অনেকগুলো নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। কিন্তু সে ভাষাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাংলা সেখানকার সরকারি ভাষা, এটা আমাদের জন্য বেশ গর্বের
আহমেদ সাজিদ
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বরকত, রফিক, সালাম, জব্বারসহ অনেকে। সেই মহান ও গুরুত্ববহ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল গোটা পৃথিবীতে। অবশেষে মায়ের ভাষার অধিকার ফিরে পায় বাঙালি। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাংলা ভাষাকে সম্মান জানানোর সুযোগ পেল। বাংলা ভাষার মাহাত্ম চর্চিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বাংলা সাহিত্য সম্ভার নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের। এ সবকিছুই বাংলা ভাষার জন্য ইতিবাচক উপাদান। এছাড়া সারাবিশ্বে বর্তমানে বাংলাভাষীর সংখ্যা প্রায় ত্রিশ কোটি। এর মধ্যে বাংলাদেশে ১৬ কোটি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে ১২ কোটি এবং সারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালি সংখ্যা কমবেশি ১ থেকে দেড় কোটি। ২০০২ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হয়। ঠিক ওই বছরই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ সিয়েরা লিওন বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলা যেভাবে সরকারি ভাষা
সিয়েরা লিওন ১৯৬১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে। তার প্রায় ৩০ বছর পর দেশটিতে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। আস্তে আস্তে গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয় দেশটি। মূলত, তত্কালীন সরকারের দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অব্যবস্থাপনার ফলে সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রায় ১ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে ধংসযজ্ঞ চলে।
১৯৯১ সালের এই গৃহযুদ্ধ নিজ চোখে দেখেছিলেন ওসমান সার। তখন তার বয়স ছিল ২১ বছর। তিনি বলেন, ‘বাবার মুখে স্বাধীনতার আগের অনেক গল্প শুনেছি। ছোটবেলায় মনে হতো অনেক কষ্ট করেছে আমার পূর্বপুরুষরা। কিন্তু আমার তরুণ বয়সে যা দেখেছি, মনে হচ্ছে ওনারা তখন বেশ ভালোই ছিলেন। এখন আমরা যেমন আছি তার থেকে হয়তো খানিকটা কষ্ট হয়েছে তাদের!’
এই গৃহযুদ্ধে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ মারা যায়, ২০ লক্ষ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে বাস্তুহারা হয়। ধ্বংস হয় দেশের অধিকাংশ অবকাঠামো। সেই সময়টাতে সিয়েরা লিওনে শান্তি ফেরাতে বিপুল পরিমাণ শান্তি বাহিনী নিয়োগ করে জাতিসংঘ। তাদের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ দেশের সেনারা সিয়েরা লিওনের বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। দেশটিতে শান্তি ফেরাতে রেখেছেন ব্যাপক ভূমিকা। বিদ্রোহীদের দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে মুক্ত করতে বাংলাদেশের সেনা সদস্যদের কার্যক্রম ছিল অনবদ্য।
বাংলাদেশ সেনাদল তাদের নিয়মিত সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন জাতির মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তা গড়ে তোলার চেষ্টা করে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ সেনারা ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ব্যবহার করতে থাকেন। বাংলা ভাষা স্থানীয় লোকজনের অপরিচিত হওয়ায় বাঙালি সেনারা তাদের ধৈর্য্যের সঙ্গে তা শেখাতে শুরু করেন। সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে খুব আগ্রহের সঙ্গে। ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাঙালি সংস্কৃতির পরিচিত হতে থাকে।
২০০২ সালের মধ্যে দেশটির যে জায়গাগুলোতে বাংলাদেশি সেনাদল ছিল সেখানেই স্থানীয়রা বিশেষত তরুণ-তরুণীরা বাংলায় কথা বলতে পারছে। বিভিন্ন সভায় স্থানীয়রা বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের বাঙালি নাচ ও গান পরিবেশন করতে দেখা যায়। বাংলাদেশ সেনাদলের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়তা পায়। স্থানীয়রা কাজ চালানোর মতো বাংলা ভাষা শিখে নেওয়ার ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাদল অন্যদের
চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়।
সিয়েরা লিওনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ৩১টি দেশের সেনাদল কর্মরত ছিল। প্রায় প্রতিটি দেশের সেনাদল যুদ্ধরত বিভিন্ন বিদ্রোহী দলের আক্রমণের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশ সেনাদল এ বিষয়ে ছিল ব্যতিক্রম। কারণ বাংলাদেশি সেনাদল তাদের দায়িত্বের প্রতি সবসময় নিষ্ঠাবান ছিল, উপরন্তু সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করতো। যে কারণে বাঙালি সেনাদের বাংলা ভাষাকে স্থানীয়দের মাঝে প্রচারের উদ্যোগটি সহজেই সফলতা পায়।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা যা করেছেন, তার জন্য সিয়েরা লিওনের সরকার কৃতজ্ঞ। ২০০২ সালে শান্তি ফিরে আসে দেশটিতে। তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ কৃতজ্ঞতা জানাতে একটুও দেরি করলেন না। বাংলা ভাষাকে সে দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। বাংলাদেশ সেনাদলের নির্মিত একটি ৫৪ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনকালে এই ঘোষণা দেন। আমরা যখন ফেব্রুয়ারিতে নিজ দেশে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা জানাই তখন সিয়েরা লিওনেও আমাদের মায়ের ভাষা সমমর্যাদা লাভ করে।
সেখানে বাংলাভাষীর সংখ্যা
সিয়েরা লিওনে প্রায় ১৬টি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা ভাষা ও রীতিনীতি। দেশটিতে দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে সরকারি প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজিতে কথা বলা হয়। বাংলা হচ্ছে সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা। কিন্তু দেশটির খুব বেশি মানুষ বাংলা জানে না। এমনকি বাংলা ভাষার ব্যবহারও কদাচিত্ দেখা মেলে। দেশটির সকল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রিও ভাষা সবচেয়ে বেশি কথ্য ভাষা। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য এবং একে অপরের সাথে সামাজিক যোগাযোগে ক্রিও ভাষা ব্যবহার করে।
বেশ কয়েকদিন আগে দেশটিতে থেকে ঘুরে এসেছেন বাংলাদেশি নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার। দেশটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশটির মানুষগুলো অনর্গল ইংরেজি বলতে পারে। সেখানকার সবকিছুতেই ইংরেজি ভাষার ব্যবহার। এছাড়া তাদের অনেকগুলো নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। কিন্তু সে ভাষাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাংলা সেখানকার সরকারি ভাষা, এটা আমাদের জন্য বেশ গর্বের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেখানে খুব কম মানুষই রয়েছেন যারা বাংলা বলতে ও লিখতে পারেন। আমি সে দেশে যতটা সময় অবস্থান করেছি, তার মধ্যে দু’জনকে পেয়েছি যারা বাংলা বলতে পারেন। তাও এত ভালোভাবে বলতে পারেন না।’
তিনি জানান, সিয়েরা লিওনের মানুষরা এখনো বাংলাদেশিদের বুকে টেনে নেয়। কারণ সে দেশের বেশিরভাগ মানুষই তাদের ইতিহাস সম্পর্কে জানে। কিন্তু বাংলা ভাষার চর্চাটা সেখানে নেই।
এই সময়ের সিয়েরা লিওন
কালো বর্ণের মানুষ পৃথিবীর এমন অনেক দেশেই আছে, যারা জাতি হিসেবে উন্নত ও ব্যক্তি বিশেষে প্রায় প্রত্যেকেই ধনাঢ্য। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার কালো মানুষের দেশ সিয়েরা লিওনের অধিকাংশ মানুষ খুবই অভাবী আর অসুখি।
কিন্তু তাদের আছে প্রচুর হিরার খনি! এটিই তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এছাড়াও রয়েছে অন্যতম পণ্য টাইটানিয়াম ও বক্সাইট, অন্যতম প্রধান পণ্য সোনা এবং রয়েছে রুটাইলের পৃথিবীর বৃহত্তম মজুদের একটি অংশ। সিয়েরা লিওনে রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক হারবর। এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও সিয়েরা লিওনের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
