তাহমিদ আহমেদ
কাজে চাপমুক্ত থাকতে আমরা সবাই চাই। মাঝে মাঝে তো ইচ্ছে হয়, যাযাবরের মতো পৃথিবীটা ঘুরে বেড়াতে! ধরুন, এমন একটি জীবন পেলেন যেখানে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন কোনো এক ঝরনার সামনে। ঠিক পরদিন সকালেই ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করলেন কোনো এক সি বিচে। এর পরদিন কোনো পাহারের পাদদেশে। আবার কোনো সময় কোনো এক পার্কিং লটে। এমন একটি সুযোগ পেলে জীবনটা কত সুন্দর হতো, তাই না? কত অ্যাডভেঞ্চারাস একটি জীবন হতো।
ওপরে বলা জিনিসগুলো কিন্তু মোটেই কাল্পনিক কিছু নয়। বাস্তবেই সম্ভব। আর সল্প খরচে এ রকমভাবে জীবনযাপন করার জন্য পৃথিবীর অনেক মানুষই বেছে নিয়েছেন ভ্যানলাইফকে। কেউ ছেড়েছেন ব্যবসা, কেউ কেউ শখের চাকরি। তবে অনেকে মাধ্যমেই করছেন আয়। ঘুরে বেড়াচ্ছেন পথেপথে। হয়ে গেছেন যাযাবর। উপভোগ করছেন জীবনটাকে নিজের মতো করে।
ভ্যানলাইফ কি সেটি পরিষ্কার করি আগে। মাইক্রোবাস কিংবা অন্যকোনো বড় গাড়ি মডিফাই করে বাসা বানিয়ে সেখানে একইসাথে ট্রাভেল করা এবং বসবাস করাই হলো ভ্যানলাইফ। এই গাড়িগুলোকে মুলত ‘আরভি’ বলা হয়। কেউ মাইক্রোবাসকে মডিফাই করছেন, কেউ স্কুলবাসকে, কেউ এম্বুলেন্সকে, কেউ বা বিশাল একটি ফায়ার সার্ভিস বাসকে। সেখানেই থাকছেন তারা। কেউ মাঝে মাঝে, কেউ বা ফুলটাইম। যারা মাঝে মাঝে থাকেন তারা ছুটি-ছাঁটা পেলেই বেড়িয়ে পড়েন। আর যারা ফুলটাইম থাকেন তারা একটি রুট ঠিক করে নেন, সেটি ধরেই চলতে থাকেন বছরের পর বছর। কেউ ট্রাভেল করছেন একা, কেউ বা সাথে করে স্বামী অথবা স্ত্রীকে নিয়ে।
গাড়িগুলোও আজব জিনিস। অল্প একটু জায়গায় বিছানা, ফ্রিজ, কিচেন, শেলফ, টেবিল, সোফা সবই থাকে। মজার ব্যাপার হলো এগুলো সবই ফোল্ড করা যায়। ফ্রিজ ব্যবহার করে চেয়ার বা সোফা হিসেবে, বিছানাকে ব্যবহার করেন বিছানা কাম সোফা হিসেবে। গাড়ির ছাদে থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী দুই বা তিনটি সোলার প্যানেল, যা দিয়ে ইলেক্ট্রনিক্সের জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়। সামনে থাকে প্রাইভিং সিট এবং পাশে আরেকজন বসার জন্য সিট। মাঝে একটা ছোট্ট কফি রাখার টেবিল। গাড়ির বাহিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকগুলো কাভার্ড থাকে, যার ভেতরে চুলার জন্য প্রোপেন, গ্যালন ভর্তি খাবার পানি আর গোসলের পানি থাকে। কোনো কোনো গাড়িতে বাইরে শাওয়ার নেওয়ার জন্য নল থাকে। ছাদে একটি বড় মোটা কাপড় ভাজ করে রাখা থাকে, যা খুললে গাড়ির সামনে দু-পাশে পাইপ দিয়ে আটকে চমত্কার ক্যাম্প করা যায়। কিছুকিছু গাড়ির পেছনে থাকে সাইকেল ঝুলানোর স্ট্যান্ড।
গাড়ির ভেতরে থাকে একটি সোফা, যেটিকে ভাজ করে বিছানা বানানো যায়। কখনো কখনো সোফা থাকে না। এরপর থাকে একটি টেবিল যেটিতে একইসাথে সিঙ্ক, চপিং বোর্ড এবং স্টোভ বসানো। স্টোভটি সাধারণত প্রোপেনচালিত। চুলার ওপরে মশলাপাতি, হাঁড়িপাতিল আর রান্নার জিনিস রাখার জন্য থাকে অনেকগুলো সেলফ। এরপর চুলার পাশেই থাকে ছোট টেবিল, যেটি ভাজ করে রাখা যায়। এই গাড়িগুলোর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এগুলোতে অনেক তাক এবং কাভার্ড থাকে এখানে ওখানে। গাড়িতে আরেকটি প্রয়োজনীয় জিনিস দরকার হয়, যা হলো ফ্রিজ। এটি আসলে সাধারণত সোফা কাম ফ্রিজ হিসেবেই ব্যবহূত হয়। এছাড়াও গাড়ির জানালা আর দরজায় থাকে বাগ স্ক্রিন, যাতে রাতে পোকামাকড় আসতে না পারে।
ভ্যানে জার্নির শুরুতেই ট্রাভেলার একটি রুট ঠিক করে নেন, চলতে থাকেন সেই রাস্তা ধরেই। রাত হলে কোনো এক সুপারশপের সামনে পার্কিং লটে থেমেই রাত কাটান। সকালে উঠে দাঁত মেজে চলে যান সেই শপের ওয়াশরুম ব্যবহার করতে।
সেখান থেকে এসে কেনাকাটা করে, নাস্তা করে, ফুয়েল নিয়ে আবার রওনা হন। পথে মাঝেমাঝে ঝরনা, পাহাড় কিংবা সমুদ্র পড়ে। সেখানে ক্যাম্প করেন। কাটান কিছুদিন। ট্র্যাকিং, সার্ফিং, স্কুবা ডাইভিংসহ আরো মজার মজার অভিজ্ঞতা নেন। এরপর আবার শুরু হয় জার্নি। এ রকম করেই একের পর এক জায়গায় যান এবং জীবনটাকে উপভোগ করেন। ভারি হতে থাকে অভিজ্ঞতার ঝুলি।
এতকিছু করা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া, থাকা, খাওয়া, এগুলোর জন্য নিশ্চই অর্থের প্রয়োজন। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে, যেহেতু তারা চাকরি কিংবা ব্যবসা না করে শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নিশ্চই তাদের অনেক অর্থ জমানো রয়েছে। আসলে ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। প্রথমত, ভ্যানলাইফে খরচ তুলনামূলক কম। বাসা ভাড়া, যাতায়াত খরচ, অন্যান্য বিল মোটামুটি বেঁচে যায়। কিন্তু বাকি খরচ চালাতেও তো অর্থ লাগে! সে অর্থ বেশিরভাগেরই আসে অনলাইন থেকে আয় করে। কেউ হয়তো আউটসোর্সিং করছেন, কেউ হয়তো রিমোটলি জব করছেন। কেউ হয়তো কোনো বিজনেসে ইনভেস্ট করে রেখেছেন। কেউ ওয়ার্কিং হলিডে থেকে আয় করছেন। আবার বাড়তি আয় করছেন ইউটিউবিং করে। পুরোটাই আসলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কোনো উইকেন্ডের মতো না।
অনেক অ্যাডভেঞ্চারাস হলেও ভ্যানলাইফে রয়েছে হাজারো সমস্যা। প্রথমত, এশিয়ার দেশগুলো ভ্যানলাইফের জন্য উপযুক্ত না, নিরাপদও নয়। সেজন্য এশিয়ার দেশগুলোতে তেমন কেউ ভ্যানে থাকেনও না। এগুলো বেশিরভাগই ইউরোপ, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়। এরপরের সমস্যা হলো ভ্যানে থাকলে ভালো ইন্টারনেট, টিভি, ভালো ওয়াশরুমের ব্যবস্থা, ভালো রুম কিংবা হাই ক্লাস চাকরি কিছুই পাওয়া যায় না। চলতে হয় টানটান হিসেব করে। পরিশ্রম করতে হয় অনেক। থাকতে হয় আত্মীয়স্বজন থেকে অনেকদূরে। কিন্তু দিনশেষে যেই অ্যাডভেঞ্চার আর জার্নিটি পাচ্ছেন, তা আপনাকে সবকিছু ভুলিয়ে দেবে!
