আমি বই পড়তাম। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা জিজ্ঞাসা করতেন, ‘বই পড়ে কী হবে?’ আমি ছোট ছিলাম, জুত্সই উত্তরটা মাথায় আসত না, যে উত্তরটা মাথায় আসত, তা বললে তারা বই পড়ার অনুমোদন দেবে না—এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম; তাই কোনো উত্তর দিতাম না, বই পড়তে থাকতাম। আজ উত্তরটা জানি। কিন্তু কেউ তেমন প্রশ্ন করে না; কারণ বই পড়ার ফলাফল তারা ইতোমধ্যে দেখেছে—আমার কথায় দুচারজন লোকের বিশ্বাস জন্মে, তাদের কেউ কেউ আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার দেয়, করে দিলে ভালো মজুরিও দেয়; আর যাদের দেবার মতো কাজ নেই, তারা আমার কথা শুনে যায়, নিজের কাজে লাগায়—মোটকথা আমাকে প্রয়োজনীয় মানুষ মনে করে, তাচ্ছিল্য করে ফেলে দেয় না। তবে সেদিনের সে প্রশ্নের উত্তর এসবের কোনোটাই নয়। উত্তর অন্য কিছু। কেউ প্রশ্ন করে না বলে দেওয়া হয় না। আজ যদি কেউ জানতে চাইত, ‘বই পড়ে কী হবে,’ উত্তর দিতাম, ‘কী হতে হবে?’ আমি জানি, এই প্রশ্নের উত্তর তাদের জানা নাই। এত কিছু ভেবে তারা প্রশ্ন করে না। কিন্তু বই পড়ে ইতোমধ্যে এইসব ভাবনা আমার মাথায় এসে গেছে। এর উত্তরটি আমি জানি—আমি জানি, কী হতে হবে। উত্তরটি হচ্ছে, ‘কিছু না।’ কিছু হবার জন্য কেউ বই পড়ে না, কিছু না হবার জন্যই পড়ে। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘ছড়ার ছবি’ যেমন বারবার পড়তাম, টলস্টয়ের গল্পগুলো নিয়ে অবসরে ভাবতাম। যা পড়লে কিছু হয়ে যাবার উপক্রম হয়, তা থেকে আমি চিরকালই ফিরে এসেছি। তাই মেডিকেল সায়েন্স পড়িনি, সায়েন্সের বইগুলো সরিয়ে রাখতাম, পাছে ডাক্তার হয়ে পড়ি; অঙ্কের বই খুলতাম না, বইয়ের স্তূপে সবার নিচে রাখতাম, পাছে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে পড়ি, যুক্তিবিদ্যার বইগুলো তাকের পেছনের সরিতে রাখতাম, বের করতে যেন কষ্ট হয়, পাছে রাজনীতিবিদ হয়ে পড়ি—অতি কষ্টে পরীক্ষায় পাস করতাম, পাছে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে বসি। অনেক কায়ক্লেশে নিজেকে অনাড়ম্বর করে রেখেছি, কিছু একটা হয়ে তাকে জবরজং করে ফেলিনি। দীর্ঘকাল আড়ম্বরহীন মানুষ থেকে, আজ যখন কিছু হবার সময় ফুরিয়েছে, সবকিছু পড়ি, নির্দ্বিধায় পড়ি—যে বিজ্ঞান বই সরিয়ে রেখেছিলাম, আজ তাই টেনে বের করে কোয়ান্টাম ফিজিক্স বুঝি, যে অঙ্কের বই চাপা দিয়ে রেখেছিলাম, তাকে তুলে এনে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বুঝি, যে তর্কশাস্ত্র লুকিয়ে রাখতাম, আজ তাই চোখের সামনে মেলে ধরে বাস্তববাদ বুঝি—খুব আনন্দ পাই। শেষ কথা—এতকালের সাহিত্য পাঠ আমাকে তাহলে কী দিল? সাহিত্য পাঠ আমাকে শূন্যতা দিয়েছে। শূন্য মানুষ করে রেখেছে, কিছু একটা দিয়ে পূর্ণ হতে দেয়নি। তাই আজ যখন, চাইলেও একটা কিছু দিয়ে পূর্ণ হবার জো নেই, সে একমনে পূর্ণ করছে। সাহিত্যপাঠ এতকাল ধরে জ্ঞানার্জনের একটি অ্যাপ্রোচ দিয়েছে কেবল—যুক্তিকে সে আমার একমাত্র অবলম্বন করে দিয়েছে, আর আমার পরম গন্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে মানবতাকে।
