ভাষা শহীদদের কী জবাব দেব?

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১০

আলিম-উর-রহিম

আমি অনেকদিন ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যাঁরা বাংলাভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন তাঁদের কেউ একজন যদি আমাদের সামনে এসে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন—তোমরা বাংলাভাষাকে কেমন রেখেছো? আমরা এমন প্রশ্নের উত্তর কি দেব?

আসলে ৫২-র ভাষা শহীদদের এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরের কথা তাঁদের সামনে দাঁড়ানোর মুখটাই আমাদের নেই। কারণ একটাই, আমরা আমাদের ভাষা ও ভাষা শহীদদের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করিনি কখনোই। এবং এখনো সেই রক্ষা না করার মধ্যেই আছি। সত্যিকথা বলতে, ভাষা শহীদদের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের ভাবনাগুলো যতটা না ব্যবহারিক তার চেয়ে বেশি তাত্ত্বিক। পাঠক, আমার কথাগুলো অন্য অর্থে নেবেন না। দেখুন, পৃথিবীতে তো কত ভাষাই আছে। প্রত্যেকটি ভাষাই আলাদা-আলাদাভাবে স্ব-স্ব জাতির মাতৃভাষা। কিন্তু বাংলাভাষার মতো আর কোনো ভাষা আছে, যে ভাষা তার জাতির দ্বারা বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে? উদাহরণ দিতে চাইলে বেশি কিছু বলতে হয় না। ‘বাংলিশ’ শব্দ আমাদের জানান দেয় আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলার বিপর্যয়ের অবস্থা! আমার জানা মতে বিশ্বে আর কোনো জাতি আছে কি না যারা নিজের মাতৃভাষাকে নিয়ে এ ধরনের টানাহেঁচড়া করে। বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলাকে বাংলাভাষার টানাহেঁচড়া না বলে অন্য আর কি বলা যায় তা আমার ভাবনায় আসছে না। তবে একটি কথা, তত্কালীন পাকিস্তানিরা যদি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারতো বাংলাভাষা আমাদের কাছে আজকের টাইপের আদরণীয় হবে তাহলে তারা সে সময় অস্ত্রের আশ্রয় না নিয়ে ভিন্ন কোনো কৌশলের আশ্রয় নিত কি না, কে জানে। হয়তো বাংলাভাষার সঙ্গে উর্দু মিশিয়ে ‘বাংলোর্দু’ ধরনের কিছু একটা দাঁড় করানোর চেষ্টা চালাতো। কেননা আমরা এখন মনের ভাব বিনিময়ের চর্চা এ ধরনের প্রবণতায় চালিয়ে যাচ্ছি!

প্রিয় পাঠক, আমি কথাগুলো মনের তাগিদ থেকে বললাম। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এই বিকৃত ভাষা চর্চার ‘বাংলিশ’ ব্যাপারটিকে আপনি বা আমি কেহই মন থেকে মেনে নেইনি। এমনকি খোদ যে বা যারা ‘বাংলিশ’ ভাষায় মনের ভাব আদান-প্রদান করায় অভ্যস্ত তারাও মানেন না মন থেকে। তবে যেটা হয়েছে সেটা হলো, তথাকথিত আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের মধ্যে অনুধাবন করার শক্তিহীনতার বিষয়টি একটা ভয়ানক প্রকট দৈন্যতার আকার ধারণ করেছে। আর যার দরুন আমরা সবাই সমানভাবে অনুধাবন করতে পারছি না যে, সে দিনের ৫২-র রাজপথে আমাদের পূর্বসূরিরা মায়ের ভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসার যে কি এক অকৃত্রিম নির্দশন দেখিয়ে ছিলেন! মোটা দাগে বললে, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের বাংলাভাষাকে আমরা আমাদের করে পেয়েছি সেই বীর ভাষা শহীদদের মর্যাদার মূল্যটা কেবল বারো মাসের এই এক মাসে ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে যাওয়াই নয়। বরং বাংলাভাষাকে বাংলাভাষার মতো করে বলার প্রচলনটি সবার মধ্যেই শুরু হয়ে গেলে সেটিই হবে বাংলাভাষা ও ভাষা শহীদদের প্রতি এবং সর্বোপরি আমাদের নিজেদের প্রতিও সম্মান ও মর্যাদার সত্যিকার বহিঃপ্রকাশ।

n লেখক: শিক্ষার্থী, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা