তৌহিদ আজিজ
ভেনিজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদই এখন দেশটির কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই পরাশক্তি যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দেশটির ওপর তাদের আধিপত্যবাদের খেলায় মেতে উঠেছে। একদিকে মাদুরো সরকারকে উত্খাতে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে রাশিয়াও তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠায় মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে এ নিয়ে একধরনের ‘টাগ অব ওয়ার’ শুরু হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভেনিজুয়েলায় অনেক বড় ধরনের ঘটনা ঘটে গেছে। বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়াও ভেনিজুয়েলা নিয়ে চুপ করে নেই। তারাও বলেছেন, দেশটির সংকট সমাধানে যা যা করণীয় তা-ই তারা করবেন। যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি কারাকাসের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়ে তাহলে তারাও বসে থাকবে না। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, আমরা ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সবরকম যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। সংকট উত্তরণে দেশটির জন্য যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা প্রস্তুত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও রাশিয়ার এই বক্তব্যের জবাবে বলেছেন, ভেনিজুয়েলার বিষয়ে মস্কোর হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। তিনি দেশটির বিষয়ে রাশিয়া যাতে কোনোরকম হস্তক্ষেপ না করে তার জন্য হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তবে তিনি এটাও বলেন যে, ভেনিজুয়েলার বিষয়ে কোনোরকম সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে তারা নন। ভেনিজুয়েলার বিষয়ে বাইরে থেকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দড়ি টানাটানি থাকলেও আরেকটি হিসাব বলছে, প্রেসিডেন্ট মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একধরনের সমঝোতায় আসতে চাইছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদুরো প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ আরিয়েজার সঙ্গে ভেনিজুয়েলা বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এলিয়ট আব্রামের অন্তত দুই দফা বৈঠক হয়েছে। নিউ ইয়র্কে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ওই বৈঠক হয়। প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এ বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন। এসব বৈঠকে আরিয়েজা মার্কিন দূতকে ভেনিজুয়েলা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মাদুরো এতদিন নানা হুঙ্কার দিলেও এই বৈঠকটি অন্য কথা বলছে। আর তা হচ্ছে গদি বাঁচাতে তিনি কী যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আঁতাতের পথ খুঁজছেন। আমরা জানি না রাজনীতির খেলায় কোনটা জয়ী হবে বা হবে না। তবে খাদের কিনারে থাকা মাদুরো কিন্তু এখন নিজেকে বাঁচাতে সবরকম চেষ্টা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। আবার বিষয়টিকে যদি আমরা সত্য বলে ধরে নেই তাহলে রাশিয়াও কিন্তু চুপ করে বসে থাকবে না। কেননা সবকিছু যদি নিজেরা নিজে ঠিক করে ফেলে তাহলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাশিয়ারও যে লোলুপ দৃষ্টি তার কী হবে। বলা যেতে পারে পরিস্থিতির বাস্তবতায় তেমটি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে স্বার্থের দিক থেকে কিন্তু দুই পরাশক্তির উদ্দেশ্যই এক। কারণ দেশটির তেলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তাদের শ্যোন দৃষ্টি বজায় রেখেছে। সে হিসেবে রাশিয়া কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। কারণ তেলের ওপর রাশিয়ার আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। আর সে কারণেই রাশিয়াকে কারাকাসের ওপর প্রভাব সরাতে মাদুরোকে উত্খাতে তত্পর যুক্তরাষ্ট্র। আবার অন্য হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রও সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কারণ গুইদোকে তারা তাদের হাতের পুতুল বানাতে পারলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে। এবার দেখা যাক, ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের কি অবস্থা। আনুমানিক ২৯৬.৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে এখানে। এটি বিশ্বের মোট মজুত তেলের ২০ শতাংশ। প্রতিদিন এখান থেকে ২৪ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন হয়, যা দেশটিকে বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ তেল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।
শুধু তেল নয়, দেশটিতে থাকা সোনাও এখন তাদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর একটি রুশ প্রতিষ্ঠানকে খনি থেকে সোনা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। রাশিয়ার সঙ্গে এ দহরম-মহরমে যুক্তরাষ্ট্র যে বেজায় চটবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই স্বর্ণ বাণিজ্যে ঢুকাও যুক্তরাষ্ট্রের আরো একটি আগ্রহের কারণ। দেশটির স্বর্ণখনিতে এখন লাখ লাখ লোক কাজ করছে। মাদুরো সরকারের এই স্বর্ণনীতিও সেখানে বেশ পরিচিতি পেয়েছে।
