স্কুলছাত্রী জেইমির মায়ের চোখে আজও ভাসে সেই দিন...

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৩

আশেক খান আলেখীন

 

গতবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি স্কুলে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। স্কুলের সাবেক এক ছাত্রের বেপরোয়া গুলিবর্ষণে মারা যায় প্রতিষ্ঠানটির ১৭ ছাত্রছাত্রী, আহত হয় আরও ১৭ জন। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল-কলেজ বা জনসমাগমের স্থানে খেয়ালের বশে এ জাতীয় খেপাটেদের এলোপাতাড়ি গুলি চালানো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সেদিনের ভালোবাসা দিবস পরিণত হয় এক বেদনাবিধুর দিনে। নিহতদের তালিকায় ছিল জেইমি গুটেনবার্গ নামে এক ছাত্রী। এবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সেই মর্মান্তিক দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন তার মা জেনিফার গুটেনবার্গ, সেইসঙ্গে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের। তিনি বলেন, দিনটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। অন্য দিনের মতই ছিল সেদিনের সকালটা। প্রথমেই দুই বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলের জন্য রেডি করে দেই, সাথে দিয়ে দেই দুপুরের খাবার। স্কুলে যেন সময়মত পৌঁছাতে পারে সেজন্য তাদেরকে তাড়াহুড়ো করে বাসে তুলে দেই। আমি তাদের জন্য ভ্যালেন্টাইন ডে’র কার্ড ও গিফটগুলো যত্ন করে রেখে দেই স্কুল থেকে ফিরে এলে পরে সেগুলো দিয়ে তাদের চমকে দেব বলে। কিন্তু জানতাম না যে ওগুলো আর কোনো কাজে আসবে না।

ওদেরকে স্কুলে পাঠিয়ে আমি আমার কাজে যাই। আমি বিভিন্ন প্রিস্কুলে শিশুদের মানসিক বিকাশের সাথে সাথে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে বিশেষ ক্লাস নিয়ে থাকি। সেদিনও বেলা পৌনে দুটো থেকে আড়াইটা পর্যন্ত আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম। জানতাম না যে কিছুটা দূরে আমার বাচ্চাদের স্কুলে কি নারকীয় ঘটনা তখন ঘটে গেছে— ঘাতকের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে আমার প্রাণপ্রিয় মেয়ে জেইমি। ক্লাসে বাচ্চাদের সাথে অনেক হাসাহাসি, মজা করে যখন বের হলাম তখন দেখলাম স্কুলের পরিচালক দরজার সামনে থমথমে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ক্লাসের বাচ্চাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাও। আমিও তাই করলাম। বাচ্চাদের নিরাপদ স্থানে রেখে এসে আমি স্কুলের  হলরুমে গেলাম। দেখলাম এক শিক্ষক সেখানে কাঁদছেন। তিনি আমাকে বললেন, মারজরি স্টোনম্যান ডগলাস হাইস্কুলে আমার কোনো বাচ্চা পড়ে কিনা। সেখানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়লো। কারন, ওই স্কুলেই তো আমার দুই ছেলেমেয়ে পড়ে। আমার ছেলেও আমাকে ফোন করলো। কোনোমতে বললো, ‘আমাদের স্কুলে একজন এসে গোলাগুলি করছে। আর  জেইমিকে  আমি

খুঁজে পাচ্ছি না।’ ছেলের ফোন পেয়েও আমি তার স্কুলে যেতে পারছিলাম না কারণ আমাকে আমার স্কুল থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। আমার স্বামী অবশ্য গাড়ি চালিয়ে ছুটে যান সেই স্কুলে। স্কুল থেকে তখন আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসছিল। তাদের মাঝে জেইমিকে খুঁজে ফিরছিল আমার স্বামীর দুই চোখ। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। একসময় স্কুল থেকে আমাকে বের হতে দেওয়া হলো। আমি তত্ক্ষণাত্ গাড়ি চালিয়ে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। কারণ ততক্ষণে আমি মোটামুটি বুঝে ফেলেছি যে আমার জেইমির কিছু একটা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম আমার স্বামীও সেখানে। আমরা আমাদের মেয়ের নাম বললাম এবং ছবি দেখালাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কিছু জানতে পারছিলাম না। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের কাছে তখন অসহ্য মনে হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একজন এসে আমাদের বললো- জেইমি তাদের ওখানে তো নেই। অন্য হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে তারা জেনেছে সেগুলোতেও মেয়েটিকে নেয়া হয়নি। আমার স্বামী পাগলের মত পুলিশদের কাছে গিয়ে মেয়ের ছবি দেখাচ্ছিল আর বলছিল ‘আমার মেয়েটাকে তোমরা কি কেউ দেখেছ?’ কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শেষ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মরত এক বন্ধু আমার স্বামীকে ফোন করে জানালো যে জেইমি আর বেঁচে নেই। তিনি নিজে জেইমির লাশ দেখেছেন। আমার স্বামী সেই মুুহূর্তে আমাকে এত বড় দুঃসংবাদটা দিতে সাহস করেনি। তবে তার ভাবভঙ্গি দেখে আমি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। এক পর্যায়ে আমার চাপে সে আমাকে মেয়ের মৃত্যুর কথা বলতে বাধ্য হলো। আমি তত্ক্ষণাত্ গাড়ির ব্রেক চেপে বাইরে বেরিয়ে এলাম এবং চিত্কার করে কাঁদতে শুরু করলাম। পুরো ব্যাপারটাই ছিল যেন একটা দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃসহ ঘটনার পর একটা বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা, কষ্ট একটুও কমেনি আমার।