রেজাউল হক কৌশিক
ব্যাংকগুলো কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে থাকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ষান্মাসিকে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসব খাতে ২৭৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তবে এর আগের ছয়মাসের চেয়ে এসময়ে সাড়ে তিনশ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। দেখা গেছে, এ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না ব্যাংকগুলো। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নির্দেশনার ৩ গুণ বেশি ব্যয় করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোকে তাদের সিএসআর খাতের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ শিক্ষা খাতে, ২০ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে এবং ১০ শতাংশ জলবায়ু ঝুঁকি বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। তবে দেখা গেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলো তাদের মোট ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যয় করেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সিএসআর এক ধরণের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা রীতি যা সমাজের প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসার নিয়মের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত নানারকম পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব দূরীকরণ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ, অসমতা ও দারিদ্র্য কমানো সিএসআরের মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর-পরবর্তী নিট আয় থেকে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষার বিষয়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের দেশ দুর্যোগপ্রবণ হওয়ায় এ খাতে ব্যয় বেশি হয়। আবার সরকার প্রধান অনেকক্ষেত্রে দুর্যোগগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যাংকগুলোকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অর্থের উত্স কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোকেই এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হয়। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়েও খেয়াল রাখে ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আলোচ্য ছয় মাসে সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে। এ খাতে ১০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। যা মোট ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তফসিলী ব্যাংকসমূহের সিএসআর খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে। এ খাতে ৮৪ কোটি তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। যা মোট ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ। এছাড়াও ব্যাংকসমূহের সিএসআর খাতে ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য খাতসমূহের মধ্যে ছিল স্বাস্থ্য খাতে ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা (১০ দশমিক ৮৬), সংস্কৃতি খাতে ২৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা (১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ) এবং অন্যান্য খাতে ২২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা (৮ দশমিক ২৮ শতাংশ)।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেশি ব্যয় বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান প্রদান, শীতবস্ত্র প্রদান এবং পদ্মা নদী ভাঙনের ফলে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদানের ব্যয় সিএসআর খাতে দেখানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রমের বিবরণীতে দেখা যায়, জুলাই-ডিসেম্বর ষান্মাসিকে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী, বাংলাদেশ কৃষি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন, বিডিবিএল, আইসিবি ইসলামী ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান সিএসআর খাতে কোন ব্যয় করেনি। এছাড়া বেসিক, মিডল্যান্ড, সীমান্ত, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, হাবিব, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং উরি ব্যাংক সিএসআর খাতে খুব সামান্য পরিমাণ ব্যয় করেছে।
ব্যয়ের শীর্ষে প্রাইম ব্যাংক: আলোচ্য সময়ে সিএসআর খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে প্রাইম ব্যাংক। এ ব্যাংকের ব্যয়ের পরিমাণ ৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া পর্যায়ক্রমে ডাচবাংলা ব্যাংক ৩৪ কোটি ৩৭ লাখ, এক্সিম ব্যাংক ২৭ কোটি ৭৯ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংক ২০ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে।
অন্যদিকে ১৭টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মোট দুই কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৮৮ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ৮০ লাখ টাকা।
