সকালের দুদফা বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল বইমেলা। তবুও বিকালে পাঠকের আনাগোনায় জমে উঠেছিল বইমেলা। মেলার স্থানে স্থানে জমে থাকা, পানি, কাদা। ইট বিছানো পথে ভিজে যাওয়া বই শুকাতে দিয়েছেন প্রকাশকরা। এসবের মাঝেই স্টলে স্টলে বিক্রি হয়েছে। সন্ধ্যার পর বেশ ভিড় জমে গিয়েছিল মেলায়। বৃষ্টির কারণে মূলমঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গতকাল বইমেলার আলোচনা বসেছিল কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে।
বৃষ্টিতে প্রায় অর্ধশত প্যাভিলিয়ন-স্টল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে — অন্যপ্রকাশ, অ্যার্ডন পাবলিকেশন্স, কথাপ্রকাশ, শিকড়, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), ত্রয়ী প্রকাশন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, বাসিয়া প্রকাশনী, নালন্দাসহ আরো বেশ কিছু প্রকাশনী। বড় প্রকাশনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়ন। কোন কোন প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান স্বীকার করেন, তাদের গাফিলতির কারণে এই ক্ষতি। আবার কোন কোন প্রকাশক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, বাংলা একাডেমি পুরানো টিন দিয়ে স্টল নির্মাণ করায় সেসব টিনের ফুটো দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে। কোথাও কোথাও টিন সরে গিয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
এদিকে, আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে আগামী ২৩, ২৪ বা ২৫ তারিখের মধ্যে আরো একবার ঝড় বৃষ্টি হতে পারে বলে একাডেমির এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এদিকে, গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত সাপ্তাহিক সাংবাদিক সম্মেলনে বৃষ্টিতে প্রকাশকদের ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বললেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে প্রকাশকদের বেশ কয়েকদিন আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। প্রায় সব প্রকাশক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু প্রকাশনীর স্টলে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা তাদের অসতর্কতার কারণে।
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস আমরা গত কয়েকদিন থেকেই প্রচার করছিলাম। সেজন্য আমাদের কিছুটা প্রস্তুতি ছিল। বৃষ্টির পরপরই ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় মেলার মাঠ থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। প্রকাশকরাও সহযোগিতা করেছেন। তাদের সচেতনতার কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টল সুরক্ষিত ছিল।
এর আগে, সকালে ফাগুনের প্রথম বৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে অমর একুশে বইমেলার দুই প্রাঙ্গণ। মেলার অধিকাংশ স্টলই কম-বেশি ভিজে গিয়েছিল। এতে বই ভেজার পাশাপাশি স্টলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রবিবার দুুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ এলাকার আশপাশে এক হাত পরিমাণ পানি জমেছিল। অন্যপাশ থেকে একটু নিচু হওয়ায় এখানকার স্টলগুলোর নিচে প্রবেশ করেছিল পানি। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মেশিনের সাহায্যে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একাডেমির পুকুর পাড়ে অবস্থিত লেখক কুঞ্জের পাশের স্টলগুলোতে পানি ঢুকেছিল বেশি। অন্যদিকে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের নিচু এলাকায় জমে থাকতে দেখা গেছে বৃষ্টির পানি। সেখান থেকেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মেশিনের সাহায্যে পানি রাস্তার ড্রেনে ফেলার কাজ করে যাচ্ছিল।
বাংলা একাডেমির সংবাদ সম্মেলন
রবিবার গ্রন্থমেলা বিষয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলন করে বাংলা একাডেমি। শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী ও মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ গ্রন্থমেলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মেলার ১৬তম দিন পর্যন্ত সর্বমোট নতুন বই এসেছে ২৪৭৭টি। আর একই দিন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি মোট ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ১০৮ টাকার বই বিক্রি করেছে বলেও জানানো হয়। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা বেশি।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হককে স্মরণ
বইমেলায় একুশের আলোচনায় অনুষ্ঠিত হয় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক : শ্রদ্ধাঞ্জলি
নতুন বই
মেলার ১৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ৭১টি। এর মধ্যে রয়েছে — সৈয়দ মিজানুর রহমান সম্পাদিত ‘নেতৃত্বে ছাত্রলীগ : ইতিহাসের অকাট্য দলিল’ (আগামী), পূরবী বসুর ‘রোকেয়া ও রবীন্দ্রনাথ : কাছে থেকেও দূরে’, রেজানুর রহমানের ‘আমাদের পিকলু বাবু’ (কথাপ্রকাশ), শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘটনাবহুল ইতিহাস’ (ত্রয়ী), সঞ্জীব দ্রংয়ের ‘ঈশ্বর সাঁওতালদের ভুলে গেছে’ (সূচীপত্র), মঈনুল আহসান সাবেরের ‘কাফকা আসবে’ (দিব্যপ্রকাশ), সায়ীদ আবুবকরের ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ (ইত্যাদি), মারুফ রসূলের ‘মুহূর্ত থামো, তুমি সুন্দর’ (পাঞ্জেরী), সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘ভাসানীর ভারত প্রবাস’ (পাঠক সমাবেশ), আবদুল মান্নানের ‘বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি’ (কথাপ্রকাশ), হারুন-অর-রশিদের ‘বাংলাদেশ রাজনীতি সরকার ও শাসনতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৭৫৭-২০১৮’ (অন্যপ্রকাশ)।
শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খালেদ হোসাইন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মফিদুল হক, আসাদ মান্নান, শিহাব সরকার এবং আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি মনজুরে মওলা।
প্রাবন্ধিক বলেন, সৈয়দ শামসুল হকের জীবনাচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিলেন সপ্রতিভ। আর তার বিপুলায়তন সাহিত্যসৃষ্টিতে লক্ষ্য করা যায় এক নিহিত ও বস্তুনিষ্ঠ পরিকল্পনা। উন্মাদনাময় এই সৃষ্টিশীলতাকে সাবলীলভাবে নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যই তাকে বাংলা সাহিত্যে অগ্রগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
আনিসুল হক বলেন, সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ভাষার সর্বাগ্রগণ্য সাহিত্যশিল্পীদের একজন। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে তার ঈর্ষণীয় বিচরণ ও অর্জন পরবর্তীকালের লেখকদের জন্য দৃষ্টান্ত। তার কাব্যনাট্য ও অন্যান্য রচনায় এদেশের মহান মুক্তিসংগ্রাম উদ্ভাসিত হয়েছে মায়াময় ব্যঞ্জনায়।
মনজুরে মওলা বলেন, ভাষার প্রতি সৈয়দ শামসুল হকের আমৃত্যু যত্নশীলতা আমাদের সাহিত্যসমাজে এক বিরল ব্যাপার, যেক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই উদাসীন। নতুন শব্দ ও ভাববন্ধ নির্মাণে তিনি ছিলেন সদাসচেষ্ট। কবি হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধির পরও তিনি নিজের জন্য কাব্যনাট্যের মতো এক দুরূহ শিল্পমাধ্যম বেছে নিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হকের মতো সাহিত্যস্রষ্টা কখন বিস্মৃত হবার নন।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি মোহাম্মদ সাদিক, খালেদ হোসাইন। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী লায়লা আফরোজ এবং মো. মাসুদুজ্জামান। মানজারুল ইসলাম সুইটের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং অনন্যা ওয়াফী রহমানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্যমঞ্চ’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশন করেন শাহনাজ নাসরিন ইলা, মামুন জাহিদ খান, মো. মনিরুজ্জামান ভূইয়া, রাকিবুল ইসলাম রাকীব, নীপা সাহা, শামীমা নাসরিন এবং অপর্ণা খান।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বদরুল হায়দার, ফরিদুর রহমান, মারুফ রসুল, স্নিগ্ধা বাউল, অঞ্জন আচার্য।
শিশুকিশোর চিত্রপ্রদর্শনী
অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতিবছর শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এ বছর প্রথমবারের মতো ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আজ সোমবার বিকাল সাড়ে চারটায় এর উদ্বোধন করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিদিন মেলা চলার সময়।
