পৃথিবী উল্টে গেলেও ক্যারিবিয়ান ওপেনার ক্রিস গেইলের কখনো আত্মবিশ্বাসের অভাব হয় না। ৩৯ বছর বয়সে যখন ওয়ানডে ক্রিকেটকেও বিদায় জানানোর ঘোষণা দিলেন তিনি, তখনো সেই পুরনো আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়াটা থাকলো তার কথায়।
দুই সিরিজের বিরতির পর আবারো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে দলে ফিরেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলবেন তিনি। এমন সময়েই আধুনিক সীমিত ওভারের ক্রিকেটের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন এ স্বঘোষিত ‘ইউনিভার্সাল বস’। জানালেন, আসছে ৩০ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের মঞ্চেই শেষবারের মতো ক্যারিবিয়ান জার্সিটা শরীরে চাপাবেন এ ব্যাটিং দানব।
এরই মধ্য দিয়ে একটা বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি ঘটবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৪শটির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৪০টি সেঞ্চুরি— এত সব অর্জনটা নিঃসন্দেহে খুবই সন্তোষজনক গেইলের জন্য। বিশ্বকাপ দিয়েই বিদায়ের ঘোষণা দেওয়ার সময় সেই পারফরম্যান্সের ঝলকানি যেন ঠিকরে বের হলো গেইলের চোখ-মুখ থেকে।
কেনসিংটন ওভালে বসে তিনি বলেন, ‘তোমরা একজন মহান মানুষের দিকে তাকিয়ে আছো। আমিই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। আর অবশ্যই আমি এখনো ইউনিভার্সাল বস। এটা কখনো বদলাবে না। আমি এ তকমাটা কবরেও নিয়েও যাবো। আমি বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আছি। বিশ্বকাপ দিয়েই বিদায় বলবো।’
গেইলের ব্যাটের পুরনো ধার না থাকলেও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জমানায় আজো তিনি ‘হট কেক’। এর ফাঁকে ফাঁকে যে অল্প সময়টুকু জাতীয় দলে খেলতেন, সেই সময়ও কখনোই দলে তার জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠতো। তা হলে কেন এ সুদিন থাকতেই বিদায়? — এ প্রশ্নটি করার সুযোগ না দিয়ে গেইলই বললেন, ‘কেন আমি সুতোটা কেটে দিচ্ছি? সত্যি কথা বলতে, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে বিশ্বকাপটাকেই আমি নিজের বিদায়ের মঞ্চ হিসেবে দেখছি। এখন তরুণদের সময়। আমি চাই এবার ওরা মজা করুক। আমি পার্টিস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ওদের মজা করাটা দেখতে চাই।’
গেইল অবশ্য বিশ্বজুরে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি আসরগুলোতে ঠিকই খেলা চালিয়ে যাবেন। আপাতত তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ব্যস্ত থাকায় গেইল ভারত ও বাংলাদেশ সফরের ম্যাচগুলো খেলতে পারেননি। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছেন গেল জুলাইয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) খেলেছেন। সেখানেও তার ব্যাটিং গড় ২০-এর নিচে।
গেইল অবশ্য নির্ভার। নিজেকে ফিট ঘোষণা করে দিয়ে জানালেন, এখনো উইকেটে তার উপস্থিতি বোলারদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। তিনি বলেন, ‘আমি ভালো অবস্থানে আছি। শারীরিকভাবে আমি ভালো বোধ করছি, আর এটা নিয়ে আমি আনন্দিত। আমি কিছু ওজনও কমিয়েছি। এখনো আমি নিজের সিক্সপ্যাক বানানোর চেষ্টায় আমি। আমি মাঠে তরুণদের সাথে তাল মিলিয়ে খেলতে চাই। তরুণদের মধ্যে তেজ এখনো আমার ভেতরে আছে, আর আমি এ বিষয়টা উপভোগ করি।’
এরপরে গেইল যা বললেন, সেটা ইংল্যান্ড তো বটেই, তামাম বিশ্বের বোলাররাই হুমকি হিসেবে দেখতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না ইংল্যান্ডের হয়ে বোলিংয়ের শুরুটা কে করে। তবে বিশ্বের যে কোনো বোলারই গেইলের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বাধ্য। আমার বয়স ৩৯ হয়ে যাওয়ার পরও এর কোনো নড়চড় হয়নি। ওরা হয়তো অন্য কিছু ভাববে— এ লোকটার দাড়িটা ধূসর হতে চলেছে, এবার ওকে বাগে পাওয়া যাবে। এটাই ইউনিভার্সাল বসকে বধ করা সঠিক সময়, এখন ওর বয়স ৩৯!’
২০১৪ সালের পর আর টেস্ট ক্রিকেট খেলেননি গেইল। গেল বছরের মে’র পর থেকে টি-টোয়েন্টিও খেলেন না। আর সব ঠিকঠাক থাকলে ক্যারিবিয়ান মাটিতে এটাই হবে গেইলের শেষ আন্তর্জাতিক সিরিজ। তিনি বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের রং গায়ে চড়ানোই এখন আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ক্যারিবিয়ানদের হয়ে খেলার জন্য আমি মুখিয়ে আছি। আমি আর যে কটা মাস দলের সাথে আছি সেই সময়টা আমি দলের তরুণদের মধ্যে নিজের অভিজ্ঞতাটা ছড়িয়ে দিতে চাই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজেই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মানুষ শেষবারের মতো ইউনিভার্সাল বসকে ঘরের মাঠে খেলতে দেখবে। শেষবার যখন আমি এ বার্বাডোজে জ্যামাইকার হয়ে খেলেছিলাম, সেবার সেঞ্চুরি করে ছিলাম। খুব দারুণ হয় যদি আমি এবারো সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারি। আশা করি, যতটুকু সম্ভব ভক্তদের বিনোদন দিতে পারবো। দিনের শেষে সবাই তো খেলাটা থেকে মজাই পেতে চায়।’
যদিও, সর্বশেষ বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে, তবে ওয়ানডেতে দলটির সাম্প্রতিক ফর্ম মোটেও ভালো না। গেল ৪০টি ওয়ানডেতে
তারা জিতেছে মাত্র ১১টিতে। এরপরও নিজের ক্যারিয়ারের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে নামার প্রাক্কালে স্মরণীয় একটি সমাপ্তির প্রত্যাশাই করছেন গেইল।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ জিততে শেষ করতে পারলে সেটা হবে রূপকথার মতো। তরুণদের কাছে আমার এ দাবি তো থাকতেই পারে। ওদের উচিত আমার জন্য এ ট্রফিটা জয় করা। আশা করি এ জয়ে আমিও কিছু অবদান রাখতে পারবো।’
